ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্ট
বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেল অংশীদারিত্ব চুক্তি (পিসিএ) অনুস্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই চুক্তি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও সুসংহত ও বহুমাত্রিক করবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ২০ এপ্রিল ব্রাসেলস সফর করেন। এ সময় তার সফরসঙ্গী ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।
সোমবার (২০ এপ্রিল) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, সফরকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ ও ভাইস প্রেসিডেন্ট কায়া কালাস-এর উপস্থিতিতে ইউরোপীয় এক্সটার্নাল অ্যাকশন সার্ভিস (ইইএএস) সদর দপ্তরে বাংলাদেশ-ইইউ অংশীদারিত্ব চুক্তি (পিসিএ) অনুস্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি বাংলাদেশ-ইইউ কূটনৈতিক সম্পর্কে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
ড. খলিলুর রহমান ও কায়া কালাস পিসিএ অনুস্বাক্ষরকে স্বাগত জানিয়ে একে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের একটি ভবিষ্যতমুখী রূপরেখা হিসেবে অভিহিত করেন। তারা আশা প্রকাশ করেন, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, উন্নয়ন ও নিরাপত্তা খাতে এ চুক্তির মাধ্যমে দুই পক্ষের সহযোগিতা আরও জোরদার হবে।
পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অভিন্ন স্বার্থে পারস্পরিক সমন্বয় বাড়বে বলেও তারা মত দেন।
পরবর্তীতে অনুষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে উভয় পক্ষ বাংলাদেশ ও ইইউর দীর্ঘদিনের অংশীদারিত্ব আরও এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে। এ সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গণতান্ত্রিক অগ্রগতি এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকারের চলমান সংস্কার, পুনর্গঠন ও উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পর্কে ইইউ প্রতিনিধিকে অবহিত করেন।
এ ছাড়া, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন উপলক্ষে বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন পাঠানোর জন্য ইইউকে ধন্যবাদ জানান তিনি। জবাবে কায়া কালাস একটি সফল ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের জন্য বাংলাদেশের প্রশংসা করেন।
বৈঠকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, আঞ্চলিক সহযোগিতা, অভিবাসন এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশাধিকারসহ অগ্রাধিকার বিষয়গুলো তুলে ধরে ইইউর সঙ্গে একটি টেকসই অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। একই সঙ্গে দ্রুত বাংলাদেশ-ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) ও বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তি (আইপিএ) নিয়ে আলোচনা শুরু করার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
রোহিঙ্গা ইস্যুতেও ইইউর মানবিক সহায়তার জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের টেকসই সমাধানে তাদের অব্যাহত সম্পৃক্ততা কামনা করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
সফরকালে তিনি বেলজিয়ামের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যাক্সিম প্রেভো-এর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন। বৈঠকে বাংলাদেশ-বেলজিয়াম সম্পর্ক পর্যালোচনার পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, যোগাযোগ, উদ্ভাবন ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।
উভয় পক্ষ চলতি বছরের শেষদিকে ব্রাসেলসে তৃতীয় বাংলাদেশ-বেলজিয়াম দ্বিপাক্ষিক কনসালটেশন আয়োজনের বিষয়ে সম্মত হয়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেলজিয়ামের দক্ষতাসম্পন্ন খাত—লজিস্টিকস, বন্দর ব্যবস্থাপনা, ফার্মাসিউটিক্যালস, প্রযুক্তি ও পানি ব্যবস্থাপনায়—বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর আহ্বান জানান। এছাড়া অভিবাসন, ভিসা ও কনস্যুলার বিষয় এবং রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়।
একই দিনে তিনি ইউরোপীয় কমিশনের স্টার্টআপ, গবেষণা ও উদ্ভাবনবিষয়ক কমিশনার একাতেরিনা জাহারিয়েভা-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে গবেষণা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও স্টার্টআপ খাতে বাংলাদেশ-ইইউ সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
হরাইজন ইউরোপ কর্মসূচির আওতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল উদ্ভাবন ও টেকসই উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
একদিনের এই সফরে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বিভিন্ন বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মো. নজরুল ইসলাম, জেনেভায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও জাতিসংঘে স্থায়ী প্রতিনিধি নাহিদা সোবহান এবং বেলজিয়ামে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও ইইউ মিশনের প্রধান খন্দকার মাসুদুল আলম।




















