অর্থ ও বাণিজ্য ১০ এপ্রিল, ২০২৬ ০৯:১৪

৮ মাসে বাণিজ্য ঘাটতি ২ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক    
সাম্প্রতিক সময়ে পণ্য আমদানি ও আমদানি ব্যয় বাড়ার বিপরীতে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় দেশে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে। সর্বশেষ চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) বাণিজ্য ঘাটতি দেখা দিয়েছে প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার। যার মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ৩ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার বা ৩১৩ কোটি ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত ব্যালান্স অব পেমেন্টস (বিওপি) সংক্রান্ত সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) দেশের বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৯১ কোটি ৩ লাখ ডলার (প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার)। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ২ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। আর চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩৭৭ কোটি ৯ লাখ ডলার। সে হিসেবে এক মাসেই বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ৩১৩ কোটি ডলার বা প্রায় ৩৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

একই সঙ্গে আগের অর্থবছরের তুলনায়ও বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) দেশের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৩৭০ কোটি ৬ লাখ ডলার বা ১৩ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার। আর চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৯১ কোটি ৩ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ৩২০ কোটি ডলার বা ৩ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ থেকে পণ্য রপ্তানি হয়েছে ২ হাজার ৯২৬ কোটি ১ লাখ ডলারের। অন্যদিকে, একই সময়ে আমদানি ব্যয় হয়েছে ৪ হাজার ৬১৭ কোটি ৪ লাখ ডলার। ফলে এই সময়ে রপ্তানি আয়ের তুলনায় আমদানি ব্যয় বেশি হয়েছে ১ হাজার ৬৯১ কোটি ৩ লাখ ডলার, যা বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণকে বাড়িয়ে দিয়েছে।

চলতি হিসাবেও ঘাটতি বেড়েছে
বাণিজ্য ঘাটতির প্রভাব পড়েছে দেশের চলতি হিসাব বা কারেন্ট অ্যাকাউন্টেও। তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) চলতি হিসাবে ঘাটতি ছিল ৩১ কোটি ৯ লাখ ডলার। তবে অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) এই ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০০ কোটি ডলারে। অর্থাৎ এক মাসেই চলতি হিসাবের ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ৭০ কোটি ডলার।

চলতি হিসাব বা কারেন্ট অ্যাকাউন্ট একটি দেশের ব্যালান্স অব পেমেন্টসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এতে পণ্য ও সেবার নিট বাণিজ্য, বিদেশ থেকে আসা আয় এবং প্রবাসী আয়ের মতো চলতি হস্তান্তর অন্তর্ভুক্ত থাকে।

আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্ত বেড়েছে
অন্যদিকে, আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্ত বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) বাংলাদেশের আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্ত ছিল ১৯০ কোটি ৭ লাখ ডলার। তবে অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০৮ কোটি ৩ লাখ ডলারে। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ট্রেড ক্রেডিট পরিস্থিতির উন্নতি এবং বিদেশি সহায়তার নিট প্রবাহ বাড়ার কারণে আর্থিক হিসাবে এই উন্নতি হয়েছে।

ট্রেড ক্রেডিটেও উদ্বৃত্ত বেড়েছে
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে ট্রেড ক্রেডিটে ১০৩ কোটি ১ লাখ ডলারের উদ্বৃত্ত ছিল। তবে জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫৬ কোটি ২ লাখ ডলারে।

ট্রেড ক্রেডিট হলো এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে পণ্য বা সেবা এখন গ্রহণ করা হলেও এর মূল্য পরবর্তীতে পরিশোধ করা হয়। ব্যালান্স অব পেমেন্টসের হিসাবে এটি স্বল্পমেয়াদি মূলধন প্রবাহ হিসেবে বিবেচিত হয়, কারণ এটি সরাসরি পণ্য আমদানির অর্থায়নের সঙ্গে সম্পর্কিত।

সার্বিক লেনদেনের ভারসাম্যে উন্নতি
তবে আলোচ্য সময়ে দেশের সার্বিক লেনদেনের ভারসাম্যে উন্নতি হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) সার্বিক লেনদেনের ভারসাম্যে উদ্বৃত্ত ছিল ১২৮ কোটি ৩৬ লাখ ডলার। আর অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪২ কোটি ৭ লাখ ডলারে। বিশ্লেষকদের মতে, আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্ত বাড়ায় সার্বিক লেনদেনের ভারসাম্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, আমাদের দেশের বাণিজ্য ঘাটতির অন্যতম কারণ হচ্ছে অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট। বিশেষত, ইরান যুদ্ধ এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে। এছাড়া নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য উন্নয়নে এখনো দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম বা পদক্ষেপ লক্ষ্যণীয় হয়নি। ফলে সামনের দিনগুলোতে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ আরও বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা যাচ্ছে।