আন্তর্জাতিক ১৪ মার্চ, ২০২৬ ১২:৪৫

যুদ্ধের সর্বশেষ এবং ট্রাম্পের হুংকার

বিমানের ৬ ক্রুর সবাই নিহত : মার্কিন সামরিক বাহিনী

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) শুক্রবার ঘোষণা করেছে যে, বৃহস্পতিবার ইরাকে বিধ্বস্ত হওয়া জ্বালানি সরবরাহকারী (রিফুয়েলিং) বিমানের সব ক্রুর মৃত্যু হয়েছে।

এক্স (সাবেক টুইটার)-এ এক পোস্টে সেন্টকম জানিয়েছে, ‘পশ্চিম ইরাকে বিধ্বস্ত হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের একটি কেসি-১৩৫ (KC-135) জ্বালানি সরবরাহকারী বিমানের ছয় ক্রু সদস্যের সবার মৃত্যু এখন নিশ্চিত করা হলো।’

সামরিক বাহিনী এর আগে এই বিমানের চার ক্রু সদস্যের মৃত্যুর কথা ঘোষণা করেছিল। বাকি দুইজনের জন্য উদ্ধার অভিযান অব্যাহত ছিল, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তাদেরও জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ পেন্টাগনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি এক বাক্যে যুদ্ধের ভয়াবহতা ফুটিয়ে তুলে বলেছেন, ‘যুদ্ধ মানেই নরক। যুদ্ধ মানেই বিশৃঙ্খলা।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা গতকাল আমাদের কেসি-১৩৫ ট্যাঙ্কারের মর্মান্তিক বিধ্বস্তের ঘটনায় দেখেছি..., খারাপ জিনিস ঘটতে পারে।’

নিহত সেনাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তারা সবাই আমেরিকান হিরো এবং আমি যেমনটা করি, আমরা সবাই ডোভারে সেই হিরোদের স্বাগত জানাব এবং তাদের আত্মত্যাগ আমাদের এই মিশনের সংকল্পে আরও দৃঢ় করবে।’

কেসি-১৩৫ স্ট্রাটোট্যাঙ্কার বিমানটি মাঝআকাশে অন্য একটি বিমানের সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পশ্চিম ইরাকে বিধ্বস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত অন্য বিমানটি ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করেছে, যার লেজের অংশের কিছু অংশ নিখোঁজ। সেন্টকম এই দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু করেছে।

সেন্টকম এর আগে এক পোস্টে জানিয়েছিল, ঘটনাটি তদন্তাধীন রয়েছে, তবে তারা নিশ্চিত করেছে যে বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার পেছনে ‘শত্রুপক্ষ বা বন্ধুত্বপূর্ণ কোনো পক্ষের গুলিবর্ষণের ঘটনা ছিল না।’

অন্যদিকে, ইরানের অনুগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জোট ‘দ্য ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’ বিমানটি ভূপাতিত করার দায় স্বীকার করেছে। তবে, গোষ্ঠীটি তাদের এই দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ দেয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়েচিয়েল লেইটার এক্স (সাবেক টুইটার)-এ এক পোস্টে জানিয়েছেন, এই ঘটনায় অন্য একটি বিমানও জড়িত ছিল, তবে সেটি ইসরায়েলে নিরাপদে অবতরণ করেছে।

মার্কিন সামরিক বাহিনী নিহত পরিষেবা সদস্যদের নাম এখনই প্রকাশ করছে না। নিকটাত্মীয়দের অবহিত করার ২৪ ঘণ্টা পর তাদের নাম প্রকাশ করা হবে।

এদিকে, শুক্রবারও ইরান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ শনাক্ত করার পর ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দেশজুড়ে সতর্কতা জারি করেছে। 

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘সতর্কবার্তা পাওয়ার সাথে সাথেই আপনাদের অবশ্যই নিরাপদ ও সুরক্ষিত এলাকায় আশ্রয় নিতে হবে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সেখান থেকে বের হওয়া যাবে না।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার ফলে ইরানের জনগণ একদিন তাদের সরকারকে পরিবর্তনের জন্য জেগে উঠবে। তবে, এই পরিবর্তন তাৎক্ষণিকভাবে নাও ঘটতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।

ফক্স নিউজ রেডিওকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি সত্যিই মনে করি যাদের হাতে অস্ত্র নেই, তাদের জন্য এটি একটি বড় বাধা। এটি একটি বিশাল বড় বাধা... এটি ঘটবে, তবে সম্ভবত তাৎক্ষণিকভাবে নয়।’

যদিও ট্রাম্প ব্যক্ত করেন, ‘বাস্তবতা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে ইরানি শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কোনো বড় ধরনের প্রতিবাদ বা দলত্যাগের লক্ষণ দেখা যায়নি।’

এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ১,৩০০-এরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। তবুও ট্রাম্প মনে করেন, ইরানিরা তাদের সরকারের বিরুদ্ধে এক সময় রুখে দাঁড়াবে।


মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, আগামী দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আরও কঠোর হামলা চালাবে। ফক্স নিউজ রেডিওকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আগামী সপ্তাহে তাদের ওপর খুব কঠোর আঘাত হানতে যাচ্ছি।’

ট্রাম্পের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো যখন ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান যুদ্ধ তৃতীয় সপ্তাহে পা দিয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্প প্রশাসন এই যুদ্ধের মাধ্যমে নিজেদের ‘আত্মবিশ্বাস ও সাফল্য’ ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করছে।

ডোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের মোহাম্মদ এলমাসরি আল-জাজিরাকে বলেন, ‘ট্রাম্প এবং প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ আমেরিকান জনগণকে যুদ্ধের সাফল্য সম্পর্কে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছেন।’ 

এলমাসরি উল্লেখ করেন যে, ট্রাম্পের এই আত্মবিশ্বাসী অবস্থানের পেছনে জনমত জরিপের তথ্য থাকতে পারে। তিনি বলেন, ‘সম্ভবত আমেরিকান ইতিহাসে এটি একটি যুদ্ধের শুরুতে সবচেয়ে কম রেটিং পাওয়া যুদ্ধ।’ যুদ্ধের কারণে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি এবং ইরাকে চার মার্কিন সেনার মৃত্যুর (সর্বশেষ তথ্য বলছে নিহতের সংখ্যা ৬) ঘটনা আমেরিকান জনগণের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। 

এলমাসরি মনে করেন, হেগসেথ ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করার বিষয়ে অনেকবার বড়াই করেছেন, কিন্তু তিনি ‘স্পষ্টতই ইরানি সামরিক বাহিনীকে অবমূল্যায়ন করছেন এবং এটি আমরা যে মার্কিন প্রোপাগান্ডা দেখছি তার কিছু অংশকে পুষ্ট করছে।’

ট্রাম্পের এই হুঁশিয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দেবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সূত্র : সিএনএন/আল-জাজিরা।য