সম্পাদকীয় ১৪ আগস্ট, ২০২৩ ০৫:০২

দেশ ছেড়ে বিদেশ 

ছবিঃ ইন্টারনেট

ছবিঃ ইন্টারনেট

তুষার আহম্মেদ: অর্থের জন্য দেশ ছাড়া আর অর্থ নিয়ে দেশ ছাড়া। এই দুটি ধরনের বিদেশ গমনেচ্ছু মানুষের কথা আমরা বরাবরই শুনে আসছি। অথচ আমরা যদি খুব কাছ থেকে দেখতে যাই তাহলে দেখতে পাই, একটু বেশি টাকা উপার্জনের জন্য দেশ থেকে বিদেশ পাড়ি। শুধু কি তাহলে অর্থের জন্যই বিদেশ পাড়ি জমান? নাকি অন্য কিছু চলুন জেনে আসি তাহলে। 

একটু ঘুরে তাকালে দেখতে পাওয়া যাবে, প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিকেরা জীবিকার তাগিদে এক দেশ থেকে অন্য দেশে যান। উন্নত জীবনই তাঁদের প্রত্যাশা। এমন অভিবাসীদের নিয়ে কয়েক বছর ধরেই জোর আলোচনা হচ্ছে।

 

তবে এটি জেনে অবাক হবেন যে বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অভিবাসী গোষ্ঠী হলো বাংলাদেশের নাগরিকেরা। অর্থাৎ অভিবাসীদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। সাল ২০২৩ এর আগস্ট মাসের এই দিনে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ম্যাককিনসে গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের এক প্রতিবেদনে এ চিত্র তুলে ধরেছে।

 

 

প্রবাসে স্বজনহীন প্রবাসীর কষ্ট বেশি! 

বুকভরা রাশি রাশি সব স্বপ্ন আর তারুণ্যের শক্তি-সাহসই হয় তরুণ-যুবক প্রবাসীর সহযাত্রী। প্রথম দিকে বিদেশে শত প্রতিকূল অবস্থা মোকাবিলা করতে হয়। বিদেশে আগে থেকে নিজের আপনজন কেউ থাকলে তার জন্য প্রতিকূলতা মোকাবিলা করা মোটামুটি সহজ হয়। তবে যার আপনজন থাকে না, তার জন্য বিদেশে প্রতিটা সমস্যা পাহাড় হয়ে দাঁড়ায়। সমস্যার পাহাড় ডিঙিয়ে সফলতার অমসৃণ পথে হাঁটার প্রাণপণ চেষ্টা করেন অদম্য বাংলাদেশি প্রবাসীরা। ভিন্ন দেশের অচেনা মাটিতে হোঁচট খেতে খেতে সফলতার পথের খোঁজে জীবনসংগ্রামে এগিয়ে যান প্রবাসীরা। 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১০ ঘণ্টা, ১২ ঘণ্টা বা এর চেয়েও বেশি লম্বা সময় হাড়ভাঙা ঘামঝরা শ্রম দেন স্বপ্ন পূরণের প্রত্যয়ে। ছুটির প্রয়োজন নেই, কাজের প্রয়োজন। যত কাজ তত বেশি টাকা। তাই শুধু চান কাজ আর কাজ! শ্রমে-ঘামে কাজে অর্থ আসে। সেই অর্থে এক সময় পরিবারের সদস্যদের মুখে হাসি ফোটে। আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যও আসে। বুকে জমানো স্বপ্নগুলোর কিছু কিছু আস্তে আস্তে আলোর মুখ দেখে।

সরোজমিনে দেশের বিভিন্ন এয়ারপোর্ট গুলোতে দেখা যায়, স্বজন হারা দেশের রেমিটেন্স যোদ্ধাদের প্রায়ই মিথ্যা আশ্বাস, প্রলোভন, বৈধভাবে বিদেশে পাঠানোর কথা বলে অবৈধভাবে পাঠানোর ঘটনা ঘটছে। মিথ্যা বিজ্ঞাপন প্রচারের দ্বারা অসংখ্য মানুষ যে শুধু সর্বস্বান্ত হচ্ছে তা-ই নয়, অনেক ক্ষেত্রেই মানুষকে বিপদে পড়তে হচ্ছে।

বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়া যাওয়ার ক্ষেত্রে, তেমনি দেখা যাচ্ছে লিবিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে নৌকায় করে ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে ইউরোপ যাওয়ার ক্ষেত্রেও। আর তার মূল্যও দিতে হচ্ছে বহু মানুষকে। প্রায় নিয়মিতভাবে নৌকাডুবির ঘটনা ঘটছে। সাগরে ডুবে মারা যেতে হচ্ছে।

দেশের জাতীয় পত্রিকায় উঠে আসা খবর থেকে জানা যায়, আবারও দালালের মাধ্যমে অবৈধভাবে লিবিয়া হয়ে সমুদ্রপথে ইতালি যাওয়ার সময় ভূমধ্যসাগরে ট্রলারডুবিতে নিখোঁজ হয়েছেন নরসিংদীর বেলাব উপজেলার ৯ যুবক। এর আগে, জুন মাসে একইভাবে সমুদ্র পাড়ি দিতে গিয়ে নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার একজনের মরদেহ উদ্ধার এবং বেলাব উপজেলার সাতজন নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। 

নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনদের দাবি, তাঁদের প্রত্যেকে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা খরচ করেছিলেন। এমন শোকাবহ ঘটনা এটাই প্রথম নয়, এর আগেও অনেক ঘটেছে। ভূমধ্যসাগর কিংবা মরুভূমিতে না খেতে পেয়েও অনেক বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু কোনোক্রমেই এমন দুঃখজনক পরিণতি রোধ করা যাচ্ছে না।

ধারণা করা হচ্ছে, বাংলাদেশের তরুণরা এসব বিষয়ে অসচেতন বলেই পাচারকারীদের ফাঁদে বেশি করে পা দিচ্ছেন। ভূমধ্যসাগরের সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাটি তারই প্রমাণ। বাংলাদেশ মানবপাচারের বড় উৎস হয়ে উঠুক—এটা আমাদের কাম্য নয়। দেশের আনাচকানাচে ছড়িয়ে থাকা পাচারকারীদের সব নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীগুলোর তৎপরতা আরো বাড়াতে হবে। আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

ফিরে দেখা, অভিশপ্ত একটি গ্রামের নাম ছিল মেহেরপুরের ট্যাংগার মাঠ। মেহেরপুর জেলা শহর থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরে কুতুবপুর ইউনিয়নের একটি গ্রাম এটি। 

চোর-ডাকাতের সেই ট্যাংগার মাঠ এখন প্রবাসীদের গ্রাম হিসেবে পরিচিতি। গ্রামে লেগেছে উন্নয়নের ছোঁয়া। নিজেদের পরিবারের অর্থনৈতিক  উন্নতির পাশাপাশি দেশের রেমিটেন্স বৃদ্ধিতে অবদান রাখছেন তারা।  অপরাধীর গ্রাম হিসেবে পরিচিত সেই ট্যাংগার মাঠের নামটিও পরিবর্তন করে এখন হয়েছে শিশিরপাড়া।   

উল্লেখ্য,তরুণদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে এবং বৈধপথে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ সম্প্রসারিত করতে হবে। আমরা চাই না আর কোনো বাংলাদেশি ভূমধ্যসাগর হোক কিংবা মরুভূমিতে হোক—এমন বেঘোরে প্রাণ হারাক। 

আমাদেরকাগজ/এমটি