আইন ও আদালত ৮ নভেম্বর, ২০২০ ০৯:২২

মায়ের সেবার বিনিময়ে জামিন দিলো হাইকোর্ট

ডেস্ক রিপোর্ট

দেশের ইতিহাসে এই প্রথম মায়ের সেবা সন্তানদের পড়াশুনার দায়িত্বভার নেয়ার শর্তে হাইকোর্ট থেকে জামিন দেয়া হয়েছে মাদক মামলার এক আসামীকে। বিচারপতি জাফর আহমেদ-এর সমন্বয়ে গঠিত মহামান্য হাইকোর্টের একক বেঞ্চ একটি রিভিশন মামলার রায় প্রদান করে আসামীকে জেলে না পাঠিয়ে প্রবেশন প্রদান করেন। আদালতে আসামীর পক্ষে শুনানী করেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। তাকে সহযোগিতা করেন আইনজীবী মো: রুহুল আমীন এবং এডভোকেট মোঃ আসাদ উদ্দিন।

রায় প্রদানের পর আইনজীবী শিশির মনির সাংবাদিকদের বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন আইনে আসামী মতি মাতবরের বছরের সাজার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে দায়েরকৃত রিভিশন মামলার রায়ে আসামীর সাজা বহাল রেখে প্রবেশন প্রদান করেন। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রবেশন আইনে মাননীয় হাইকোর্ট কর্তৃক প্রদত্ত দ্বিতীয় রায়। আর বিশেষ আইনে এটি প্রথম রায়। যা অত্যন্ত আশাপ্রদ এবং যুগান্তকারী।

মামলাসূত্রে জানা যায়, আসামী মতি মাতবর এবং অপর একজন আসামীর নিকট ৪১১ পিস এবং ৭০০ পিছ ইয়াবা উদ্ধারের অভিযোগে ২০১৫ সালের ২৩ নভেম্বরে ঢাকার কোতোয়ালী থানায় একটি মামলা দায়ের হয়। পুলিশ আসামীদ্বয়কে বিজ্ঞ চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। বিজ্ঞ আদালত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ ২৪ নভেম্বর ২০১৫ তারিখে চার্জশীট দাখিল করে। মামলাটি বিচারের জন্য বিজ্ঞ মহানগর দায়রা আদালত, ঢাকা- স্থানান্তরিত হয় এবং সেখানে দায়রা মামলা নং ৭২৩/২০১৬ হিসাবে রেজিস্ট্রি হয়। বিজ্ঞ দায়রা আদালত অপরাধ আমলে গ্রহণ করেন এবং বিচারের জন্য বিজ্ঞ যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ, আদালত নং-, ঢাকা- প্রেরণ করেন। ২৯ মার্চ ২০১৬ তারিখে বিজ্ঞ যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ, আদালত নং-, ঢাকা আসামীদ্বয়ের বিরুদ্ধে ১৯৯০ সালের মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ধারা ১৯() ১৯() তৎসহ টেবিল () এর অধীন চার্জ গঠন করেন।

রাষ্ট্রপক্ষ কর্তৃক উপস্থাপিত জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে ০৮ জানুয়ারী ২০১৭ তারিখে বিজ্ঞ যুগ্ম মহানগর হাকিম আদালত আসামীদ্বয়কে বছরের সশ্রম কারাদন্ড ২০ হাজার টাকা জরিমানা প্রদান করেন। উক্ত রায়ে সংক্ষুব্ধ হয়ে আসামীদ্বয় বিজ্ঞ মহানগর দায়রা আদালতে ফৌজদারী আপীল নং- ১৭৯/২০১৭ দায়ের করেন। ১১ মে ২০১৭ তারিখে আপীল শুনানি অন্তে বিজ্ঞ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ, আদালত নং-, ঢাকা আপীলটি খারিজ করে দেন এবং বিচারিক আদালতের রায় বহাল রাখেন। আপীলের রায়ে সংক্ষুব্ধ হয়ে আসামী মতি মাতবর জুলাই ২০১৭ তারিখে হাইকোর্ট বিভাগে রিভিশন মামলা দায়ের করেন। আসামী ২৩ নভেম্বর ২০১৫ তারিখে গ্রেফতারের পর দীর্ঘ ২০ মাস যাবত কারাভোগ করছিলেন। ০৯ জুলাই ২০১৭ তারিখে হাইকোর্ট বিভাগ তাকে জামিন প্রদান করেন।

পরবর্তীতে উক্ত রিভিশন মামলাটি পূর্ণাঙ্গ শুনানীর জন্য কার্যতালিকায় আসে। শুনানীর এক পর্যায়ে আইনজীবী শিশির মনির আদালতের কাছে নিবেদন করেন যে, মামলায় প্রবেশন অধ্যাদেশ, ১৯৬০ এর ধারা অনুযায়ী আদেশ দেয়া যেতে পারে। যেহেতু তার এটিই প্রথম অপরাধ এবং আর কোন অপরাধের সাথে জড়িত থাকার কোন রেকোর্ড নেই। তিনি আগামীতে কোন অপরাধ করবেন মর্মে ধারনা করার মত কোন তথ্য নেই। সে কারনে তিনি প্রবেশন আইনে সুযোগ পেতে পারেন।

যদিও আমাদের দেশে এই জুরিসপ্রুডেন্স খুব বেশি আগায়নি। সামান্য পরিমাণ সাজাতেও একজনকে কারাগারে পাঠানো হয়। অথচ উন্নত বিশ্বে বড় সাজা হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আচার-আচরণ, গুণাবলি বিবেচনায় তাকে প্রবেশনে রাখা হয়। আসামী যেন নিজেকে শুধরে নিতে পারেন, সেই সুযোগটা তাকে দেয়া হয়।

রায়ে মাননীয় আদালত দেড় বছরের জন্য প্রবেশন মঞ্জুর করেছেন। আদালত কয়েকটি নির্দেশনা প্রদান করেন। আসামীকে তার পারিবারিক বন্ধন বজায় রাখতে হবে। মায়ের সেবা করতে হবে। ছেলে মেয়ের লেখাপড়া দেখাশোনা নিশ্চিত করতে হবে। আইন অনুযায়ী বয়স না হওয়া পর্যন্ত মেয়ের বিবাহ দিতে পারবে না।

বাংলাদেশের আইনের ইতিহাসে বিশেষ আইনে এটিই প্রথম রায়। বিচারপতি আসামী মতি মাতবরকে প্রবেশন প্রদানের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী রায় প্রদান করলেন।