আপনি ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে কেন দেখছেন প্রাক্তনকে?
আমাদেরকাগজ ডেস্ক : নিজের সঠিক তথ্য না দিয়ে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খোলার মাধ্যমে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রাক্তন প্রেমিক-প্রেমিকার গতিবিধির ওপর নজর রাখেন। এতে প্রাক্তনের কাছে ধরা পড়ার ঝুঁকিও তুলনামূলক কম। কারণ প্রাক্তনের স্টোরি দেখলেও সেখানে ভিউয়ারের তালিকায় নিজের নাম ওঠার সম্ভাবনা কিংবা ভুলে কোনো একটি পোস্টে লাইক পড়ে গেলেও সেখানে ভয়ের কিছু থাকে না।
এমনকি বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রাক্তন প্রেমিক-প্রেমিকার গতিবিধির ওপর নজর রাখতে ভুয়া অ্যাকাউন্টেরও কোনো প্রয়োজন পড়ে না। কারণ অনেক সময় বিচ্ছেদের পরও প্রাক্তনরা একে অন্যের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আইডির বন্ধু বা অনুসারীর তালিকায় রয়েই যান। ফলে প্রাক্তন কী কী করছে, সেগুলো দেখা আরও সহজ হয়।
পিউ রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ৫৩% ব্যবহারকারী অন্তত একবারের জন্য হলেও তাদের প্রাক্তনের প্রোফাইলে ঢুঁ মারার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফেইক অ্যাকাউন্ট খুলেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রাক্তনের গতিবিধির ওপর নজর রাখা কোনো ইতিবাচক বিষয় না হলেও ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী ৭০% মার্কিনদের মধ্যেই এ অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসটি রয়েছে। কিন্তু এ ধরনের প্রবণতার কারণ এবং সেটি আমাদের জন্য ক্ষতিকর কি-না, সেটি নিয়ে স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম এল পাইসে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রযুক্তিগত নানা ক্ষেত্রে আসক্তির বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মনোবিজ্ঞানী গ্যাব্রিয়েলা পাওলি বলেন, “এই আচরণের পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে। সবচেয়ে বড় কারণটি হলো কৌতূহল। একজন মানুষ আমাদের জীবনে আর নেই, ফলে ভার্চুয়াল উপস্থিতিতে আমরা তাকে খুঁজে বেড়াই। আমাদের জানার কৌতূহল হয় যে প্রাক্তন কী করছে বা এখন কার সঙ্গে আছে… এই তথ্যগুলো পাওয়ার মাধ্যমে তার সঙ্গে এক ধরনের ছদ্ম-যোগাযোগ তৈরি হয়।”
একাকীত্ব অনুভব থেকেও অনেকে এমন কাজ করেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বিচ্ছেদ আমাদের মধ্যে শূন্যতা সৃষ্টি করতে পারে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রাক্তনের ওপর নজর রাখার মাধ্যমে তাকে জীবনে রাখার একটা চেষ্টা চালানো হয়।”
শূন্যতা পূরণের উপায়মাত্র
স্পেনের কলেজ অব সাইকোলজিস্টস অব গ্যালিসিয়ার কারমেন গঞ্জালেস হারমো জানান, বিচ্ছেদের পরে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়, এটি তা পূরণ করারই একটা উপায়মাত্র।
তিনি বলেন, “বিচ্ছেদের পর আমরা করা কাজগুলোর মধ্যে এক ধরনের শূন্যতা থাকে; আপনার অভ্যাসগুলোর পরিবর্তন হয়। ওই মানুষটি (প্রাক্তন) সম্পর্কে যা যা জানতেন, সেগুলো আপনার জীবনের একটা সময়জুড়ে দখল করে থাকত। সেই মানুষটার সঙ্গে কথা বলা, তার সঙ্গে কাটানো সময়…এসব স্মৃতি মনে আসে এবং পুরোনো-পরিচিত অভ্যাসে ফিরে যাওয়ার দিকে মন টানে। অনেকটা এমন যে, আমাদের মন চায় ওই মানুষটাকে নিয়েই সেই সময় পার করতে।”
তবে মনোবিদ ইয়োলান্ডা মেদিনা মেসার ধারণা, “পুরো বিষয়টা একটা সম্পর্ক কেমন ছিল এবং বিচ্ছেদটা কীভাবে হয়েছে তার ওপর নির্ভর করে।”
তার ভাষ্যমতে, “যদি আগের সম্পর্কে নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি থেকে থাকে এবং মিথ্যা বলা বা বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে সম্পর্ক শেষ হয়, তাহলে এটা খুবই স্বাভাবিক যে কেউ তার প্রাক্তনের আইডি স্ক্রল করবে এবং যেকোনো উপায়ে ওই ব্যক্তির জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইবে।”
অন্যদিকে, কখনো কখনো শুধু একঘেয়েমি কাটাতেই মানুষ তার প্রাক্তনের আইডি ঘুরে দেখে উল্লেখ করে। গ্যাব্রিয়েলা পাওলি বলেন, হয়তো যে মানুষটার সাথে বিচ্ছেদ হয়েছে তার কথা ভাবছেন, তখনই চটজলদি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার আইডিতে ঘুরতে যান; সে কী করছে, কী আপলোড দিয়েছে দেখার আগ্রহ হয়। একঘেয়েমি থেকেও হয় এমনটা।
বিচ্ছেদ যদি অল্প কিছুদিন আগে হয়ে থাকে, তাহলে এ আচরণ আরও বেশি দেখা যায়। কিন্তু বহুদিন আগে বিচ্ছেদ হলেও অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রাক্তনের ওপর নজর রাখতে ভুলেন না… এক্ষেত্রে কৌতূহলই মূল কারণ বলে জানান পাওলি। যদিও এখান থেকে এও ধারণা করা যায় যে এখনো সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি।
মানসিক সমস্যা যেন না হয়
যার সঙ্গে প্রেমের এবং রোমান্টিক সম্পর্কে ছিলেন, তার ইনস্টাগ্রাম আইডি দুই-একবার ঘুরে দেখা খুব উদ্বেগজনক কিছু না। এতে সমস্যা হওয়ারও কিছু না। কিন্তু এ প্রবণতা কোনো মানসিক সমস্যা পরিণত হয়েছে নাকি, সেটা কীভাবে বোঝা যাবে?
পাওলি এ প্রসঙ্গে বলেন, আমাদের আগে বুঝতে হবে কেউ তার প্রাক্তনের আইডি কতবার দেখে এবং তখন সে কী ধরনের আবেগ অনুভব করে। একজন ব্যক্তি অবশ্যই বুঝতে পারবে যে কোনটা সাময়িক আর কোনটা ঘোরে (অবসেশন) পরিণত হচ্ছে।
পার্থক্য আরও স্পষ্টভাবে বোঝার জন্য গঞ্জালেস হারমোর পরামর্শ হলো, প্রাক্তনের আইডি দেখার পরপর কী অনুভূতি হয় সে সম্পর্কে সজাগ থাকা। যদি দেখা যায় আপনার মন শান্ত হচ্ছে না, যদি দুঃখ বোধ করেন বা ক্ষোভ ও ঈর্ষা অনুভব করেন, তাহলে এ কাজ আপনার আর না করাই উত্তম।
তিনি আরও জানান, এটা একটা দুষ্টচক্রের মতো। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রাক্তনের উপস্থিতির ওপর নজর না রাখলে পাল্টা এক ধরনের উদ্বিগ্নতা তৈরি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বদৌলতে প্রাক্তন সম্পর্কে তথ্য জোগাড় করাটা আমাদের জন্য অনেক সহজ হয়ে গেছে। অতীতে প্রাক্তন সম্পর্কে তথ্য নিতে অনেক গভীরে গিয়ে খোঁজখবর নিতে হতো বা অন্য তার পরিচিত কাউকে জিজ্ঞেস করতে হতো। যখন আমাদের মনে হয় যে কোনো একভাবে শূন্যতা পূরণ হচ্ছে (যদিও এতে মানসিকভাবে ভালো অনুভব করা যায় না), তখন থেমে যাওয়া কঠিন।
এ মনোবিদ আরও বলেন, কিন্তু এ আচরণ যদি আমাদের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও পারিবারিক বা কর্মজীবনে বিঘ্নতা সৃষ্টি করে, তাহলে এটা দুশ্চিন্তার কারণ। সেই পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই এ অভ্যাস ছেড়ে দেওয়া উচিত।
বাস্তবে যা করেন, অনলাইনেও সেটাই করুন
কমেডি-ড্রামা সিরিজ ক্রেজি “এক্স গার্লফ্রেন্ড”র দ্বিতীয় সিজনের একটি গানে প্রাক্তনের বর্তমান সঙ্গী/সঙ্গীনির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট ঘুরে দেখার প্রবণতার কথা উঠে এসেছে। এটিও সেই একই রকম ক্ষতিকর চর্চা।
গ্যাব্রিয়েলা পাওলি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রাক্তনের অ্যাকাউন্টে ঘুরতে থাকলে সেই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়ে। আপনি বাস্তবে যা করেন, অনলাইনেও আপনাকে সেটাই করতে হবে। বাস্তবে যেমন আপনি চান না প্রাক্তনের সঙ্গে বা তার পরিচিত কোনো বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আপনার দেখা হোক; তেমনই অনলাইনেও আপনার জীবন থেকে তাদের মুছে ফেলতে হবে। যদি নিজেকে সংযত করতে না পারেন, তাহলে তাদের ব্লক দিতে হবে। কোনো কথাও যদি না বলেন, তাদের মেসেঞ্জার বা হোয়াটসঅ্যাপে অনলাইন দেখলেও শোক জেগে ওঠে।
মেনে নিন, সহযোগিতা করুন ও আনন্দদায়ক কাজে যুক্ত হোন
প্রাক্তনের ইনস্টাগ্রাম আইডি ঘুরে দেখা থেকে বিরত রাখার জন্য গ্যাব্রিয়েলা টোটকা দিয়েছেন। এ মনোবিজ্ঞানী বলেন, মেনে নেওয়া, সহযোগিতা করা এবং আনন্দদায়ক কাজকর্মে যুক্ত থাকা- এ তিনটির সমন্বয়ে এ ফর্মুলা। প্রথম ধাপ হচ্ছে, বিচ্ছেদ যেভাবেই হোক না কেন, সেই পরিস্থিতিকে মেনে নেওয়া; যত দ্রুত ভার্চুয়াল যোগাযোগ বন্ধ হবে, বিচ্ছেদের বিষয়টি মেনে নেওয়া তত বেশি সহজ হবে।
তিনি আরও বলেন, পরামর্শ দেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই যে ডিভাইসের মাধ্যমে প্রাক্তনের সাথে সংযুক্ত থাকার ফলে কত রকমের অস্বস্তিকর অবস্থা তৈরি হচ্ছে। সারাক্ষণ প্রাক্তন কী করছে সেই চিন্তা মাথায় ঘুরতে থাকায় আমরা এমন একজনকে নিজের জীবনে জায়গা এবং সময় দিয়ে রাখি, আমাদের জীবনে এখন আর যার অস্তিত্ব নেই।
গ্যাব্রিয়েলা বলেন, কেউ মারা গেলে আমরা শোকাহত হই- কিন্তু এক্ষেত্রে আপনাকে মেনে নিতে হবে যে এ ব্যক্তি আপনার জীবনে নেই কারণ সে থাকতে চায়নি বা আপনারা দুজনেই একসঙ্গে না থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এটা কিন্তু মৃত কাউকে স্মরণ করার মতো ব্যাপার না।
পাওলির ফর্মুলার দ্বিতীয় অংশ হচ্ছে সহযোগিতা; অর্থাৎ পরিবার ও কাছের বন্ধুদের ওপর নির্ভর করা। তৃতীয় অংশ হচ্ছে নিজেকে সক্রিয় রাখা এবং মন ভালো রাখার জন্য অন্যান্য আনন্দদায়ক কাজে মনোনিবেশ করা।
তবে এই ফর্মুলায় চতুর্থ আরেকটি জিনিস যুক্ত হতে পারে। সেটি হলো মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে পেশাদার কারও কাছ থেকে সহায়তা নেওয়া যেন আপনি এই অবস্থা কাটিয়ে উঠতে পারেন; যিনি আপনাকে ঘুরে দাঁড়াতে প্রয়োজনীয় সবকিছু দিয়ে সাহায্য করতে পারবেন। তবে নিজেকে ভালোবাসা, বিশ্রাম ও শান্তি দেওয়া এবং আপনাকে ভালোবাসে ব্যক্তিদের সহায়তা নিতে দ্বিধা না করার পরামর্শ দেন গঞ্জালেস হারমো।
সবশেষে তিনি বলেন, আপনার ঈর্ষা অনুভূত হলে মনে রাখবেন যখন কেউ আমাদের ছেড়ে যায়, সে আমাদের জীবনের সত্যিকারের গুরুত্বপূর্ণ কিছু ছিনিয়ে নিতে পারে না। ওই ব্যক্তি আমাকে যা দিয়েছে বলে মনে হয়, তা আসলে আমাদের আগে থেকেই ছিল।
আমাদের মূল লক্ষ্য হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রাক্তনের প্রোফাইল ঘুরে দেখার প্রতি কোনো আগ্রহ না দেখানো। মেদিনা মেসা বলেন, যে কারণে সম্পর্কটা ভেঙেছে সেগুলোই আসলে বাস্তবতা; সেই কারণগুলো মনে করলেই আমাদের আর প্রাক্তনের প্রোফাইল দেখার আগ্রহ জন্মাবে না। কারণ আমরা জানি আমরা কোনটা চাই আর কোনটা চাই না।
আমাদেরকাগজ / এইচকে