ডেস্ক রিপোর্ট।।
ক্যাসিনো, জুয়া, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে 'জিরো টলারেন্স' নীতির মাধ্যমে সাড়াশি অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। দেশের হৃদপিন্ড চট্টগ্রাম বন্দরের দিকে একটু নজর দিলে 'পূর্ব দিগন্তে এক স্বেচ্ছাচারি তরফদারের কালো অধ্যায় উন্মোচিত হবে। সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগীরা এ সুদিনের অপেক্ষায়।
একক দখলদারিত্ব ও দীর্ঘকাল ধরে অনিয়ম . দূর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে একছত্র আধিপত্যের ফলে সাইফ পাওয়ার টেক' নামে একটি বেসরকারি অপারেটর দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলে দৈত্যে রূপ নিয়েছে। দেশের গোল্ডেন গেটওয়ে ও বিশ্বের অন্যতম প্রাকৃতিক বন্দর 'চট্টগ্রাম বন্দর'কে ঘিরে সাইফ পাওয়ার টেকের মালিক তরফদার রুহুল আমিনের কালো স্বর্গরাজ্য 'ইদানিংকালের টক অফ দি কান্ট্রি 'ক্যাসিনো কান্ডকেও হার মানায়।
জানা যায়, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের( পিডিবি) এক সময়কার মিটার রিডার তরফদার রুহুল আমিন মগবাজারে 'সেঞ্চুরি আর্কেডে' চশমার দোকানের মাধ্যমে ব্যবসা শুরু করে। এছাড়া জেনারেটর মেরামত ও সাপ্লাই কাজে তিনি নিযুক্ত ছিলেন। বিএনপি জামায়াত সরকারের আমলে ২০০৫ সালে জামালপুর জেলার সংসদ সদস্য মাহমুদ বাবুর সাথে পার্টনার শীপে জালিয়াতির মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরে ক্রেন অপারেটারের কাজ নেয়। এক্ষেত্রে বিএনপি-জামায়াত সরকারের তৎকালীন নেৌ পরিবহন মন্ত্রী লে: কর্ণেল(অব:) আকবর হোসেনের পৃষ্টপোষকতা তার জন্য শাপে বর হয়।
সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, কর্তৃপক্ষ ও স্টেকহোল্ডারদের অর্থ ও অংশীদারিত্ব দেয়াসহ নানাভাবে ম্যানেজ করে ১২ বছর ধরে সাইফ পাওয়ার টেক একক অপারেটারের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরকে জিম্মী করে রেখেছে এবং শত শত কোটি টাকা লুটপাট করে যাচ্ছে।
সাইফ পাওয়ার টেক ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বধায়ক সরাকরের আমলে কোন প্রকার অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও লাইসেন্স ছাড়াই চিটাগাং কন্টেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) এ ছলে বলে কৌশলে কন্টেইনার হ্যান্ডিলিং এর কাজ বাগিয়ে নেয়। ১/১১ ফখরুদ্দীন -মঈনুদ্দীনের সরকারের প্রশাসনের দুষ্ট চক্রের সাথে ভাগ্যকে আরো সুপ্রসন্ন করে তোলে। ২০০৭ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত কোন প্রকার টেন্ডার বা কোন প্রকার অনুমোদন ছাড়া শুধুমাত্র তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের টাস্কফোর্সের একটি চিঠির মাধ্যমে কাজ চালিয়ে যায় ।২০১৪ সাল থেকে আজ অবধি তথাকথিত ডিপিএমের মাধ্যমে কাজ করে যাচ্ছে।
২০০৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত সিসিটিতে কয়েকবার টেন্ডার আহবান করা হলেও প্রতিবারই সরকারের উর্দ্বতন মহল এবং সংসদীয় কমিটির সংগে যোগসাজোশ করে টেন্ডারে এমন সব শর্ত আরোপ করে যাতে, যাতে যোগ্যতা থাকা সত্বেও সাইফ পাওয়ার টেক ছাড়া অন্য কোন প্রতিষ্ঠান অংশ নিতে পারেনি। এককভাবে কাজ করার ফলে কোন ধরণের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে না। এতে করে সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থের অপচয় হচ্ছে।
সিসিটি ও এনসিটিতে সাইফ পাওয়ার টেকের খেয়াল খুশী মত জাহাজের লোডিং আনলোডিং হওয়ার ফলে বন্দর ব্যবহারকারীরা জিম্মী হয়ে পড়েছে এবং কাংখিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
২০১৫ সালে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রীসভা কমিটিকে এড়িয়ে ২০ শতাংশ অধিকমূল্য সত্বেও এনসিটি আবারো করায়ত্ত করে। অথচ চট্টগ্রাম বন্দরে একাধিক অভিজ্ঞ বার্থ অপারেটর থাকলেও নানা কৌশলে তাদের টেন্ডারে অংশ নিতে দেয়া হয়নি বা অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। এক্ষেত্রে সম্প্রতি গ্রেপ্তারকৃত টেন্ডার মাফিয়া জিকে শামীমের প্রতিচ্ছবি হলো তরফদার রুহুল আমিন।
কিছু দিন আগে সিসিটিতে দরপত্র আহবান করা হলে ৪টি প্রতিষ্ঠান দরপত্র কেনে। কিন্তু পেশী শক্তি টেন্ডার ও ক্যাসিনো মাফিয়া শামীম ও খালেদের মতো আগ্রাসী তৎপরতার ছোবলে পড়ে ৩টি প্রতিষ্ঠান দরপত্র দাখিল করতে পারেনি। অদৃশ্য কারণে ও অপ্রয়োজনীয় শর্ত আলোপ করায় সাইফ পাওয়ার টেক ছাড়া বাকীরা ছিটকে পড়ে। আর আদালতে মামলার ফলে নিউ মুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল ( এনসিটি) এর দরপত্র কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি সম্বলিত এনসিটি ও সিসিটিতে বার্থ ৭টি। এগুলোর একমাত্র অপারেটর এখন সাইফ পাওয়ার টেক। ফলে লোডিং আনলোডিং এ একটি মাত্র প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভরতার ফলে চট্টগ্রাম বন্দর জিম্মী ও ঝুকিতে রয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেইনার লোডিং আনলোডিং করার মতো তিন দশকের বেশী অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একাধিক দেশীয় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। শিপিং এজেন্ট, বিজিএমইএ,, বন্দর ব্যবহারকারী ও চেম্বার প্রতিযোগিতার মাধ্যমে এনসিটি ও সিসিটিসহ সকল টার্মিনালের কাজে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে অপারেটর নিয়োগের জন্য সোচ্চার। সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে তদন্ত করালে সঠিক বিষয়টি জনসমক্ষে আসবে।
সাইফ পাওয়ার টেক সিসিটি, এনসিটি, পানগাও. ঢাকা আইসিডি বন্দরের ওভারফ্লো ইয়ার্ডে কন্টেইনার হ্যান্ডলিঙ, বন্দরে ইক্যুইপমেন্ট সরবরাহ ও পতেংগা টার্মিনাল কাজের সংগে যুক্ত । এসব কাজে কোন প্রতিযোগিতামূলক টেন্ডার না হওয়ায় অনিয়ম ও দুর্নীতি হচ্ছে। ফলে সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থের অপচয় হচ্ছে।
এদিকে গত ২৮ আগষ্ট অর্থমন্ত্রী আ ফ ম মোস্তফা কামাল সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রী পরিষদ বৈঠকে বলেন, ''টিচাগাং কন্টেইনার টার্মিনালের কার্যাদেশ দেয়ার সময় সরকার যেন একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে জিম্মী না থাকে। প্রয়োজনে একাধিক প্রতিষ্ঠান খুজে বের করার পাশাপাশি সরকারও যেন এ কাজ করতে পারে'।
চট্টগ্রাম বন্দরের সিংহভাগ কাজ বাগিয়ে নেয়ায় সাইফ পাওয়ার টেক এবং এর মালিক তরফদার রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে এক সময় আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা এবিএম মহিউদ্দিন চেৌধুরী। তিনি তখন বলেছিলেন, বন্দরের টাকায় বিদেশে প্রশিক্ষণ নেয়া কর্মীরা অলস বসে আছে। তাদের মেধা কাজে লাগিয়ে বন্দরের কাজে আরো গতিশীলতা আনা যায়। কিন্তু তখন মহিউদ্দন চেৌধুরীকে কোনঠাসা করতে স্থানীয় তিন আওয়ামী লীগ নেতা তরফদারের সমর্থনে এগিয়ে আসে।
এ অবস্থায় সরকারি অর্থের অপচয় রোধে একক প্রতিষ্ঠানের স্বেচ্ছাচারিতা, জিম্মী দশা ও ঝুকির থেকে মুক্তির লক্ষ্যে বন্দরে একাধিক অপারেট নিয়োগের কোন বিকল্প নেই। এজন্য চিটাগাং কন্টেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) এবং নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল ( এনসিটি)






















