আমাদের কাগজ রিপোর্ট: স্থপতি ইমতিয়াজ মোহাম্মদ ভূঁইয়া (৪৭) হত্যা মামলা তদন্ত করতে গিয়ে কেচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ পেয়েছে ডিবি পুলিশ। তদন্ত পরবর্তী সাংবাদিক সম্মেলনে এভাবেই তাদের তথ্য উপস্থাপন করে ডিবি।
পুলিশ বলেন, সমকামীদের একটি চ্যাটিং অ্যাপসের মাধ্যমে স্থপতি ইমতিয়াজ মোহাম্মদ ভূঁইয়ার (৪৭) সঙ্গে পরিচয় হয় আলিফ নামের এক ব্যক্তির। চ্যাট-এর মাধ্যমে তাদের সখ্য বাড়ে। একপর্যায়ে আলিফ কলাবাগান থানার ক্রিসেন্ট রোডের আরাফাতের বাসায় যেতে বলে ইমতিয়াজকে। সেখানে যাওয়ার পর একটি কক্ষে আলিফ ও ইমতিয়াজ আপত্তিকর সম্পর্ক স্থাপন করে। ওই অবস্থায় পূর্ব-পরিকল্পনা অনুযায়ী আলিফের সহযোগী আরাফাত, মেঘ, মুন্না ও আনোয়ার নামের কয়েকজন সেই কক্ষে প্রবেশ করে। তারা ওই ইস্যুকে কেন্দ্র করে ইমতিয়াজকে মারধর করে এবং মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে। না হলে বিষয়টি সবাইকে জানিয়ে দেবে বলে হুমকি দেয়। ইমতিয়াজ টাকা দিতে অপারগতা জানালে তার বুকে, পিঠে প্রচণ্ড মারধর করা হয়। মারধরের কারণে তার মৃত্যু হয়। মৃত্যু নিশ্চিত হলে তারা কৌশলে বাসা থেকে ইমতিয়াজের মরদেহ বের করে মেঘের প্রাইভেটকারে তোলে।
পরে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান থানা এলাকার কামারকান্দা গ্রামের নবাবগঞ্জ হাইওয়ে রোডের পাশে ঝোপে ফেলে দেয়া হয় মরদেহ। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এই ক্লুলেস হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের সঙ্গে তৃতীয় লিঙ্গের নারীসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো- মিল্লাত হোসেন মুন্না ওরফে মুন (১৯), এহসান ওরফে মেঘ (২৩) ও আনোয়ার হোসেন (৩৮)। রোববার সিরাজগঞ্জ, মানিকগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নারায়ণগঞ্জ বন্দর থানার একটি গ্যারেজ থেকে হত্যাকাণ্ডের সময় ব্যবহৃত একটি গাড়ি জব্দ করা হয়।
ডিবি জানিয়েছে, ইমতিয়াজ ঢাকার তেজগাঁও থানা এলাকার মোহাম্মদ হোসেন ভূঁইয়ার ছেলে। তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বাড়ির নকশার কাজ করতেন। তার স্ত্রী, এক ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। ৭ই মার্চ বাড়ি থেকে বের হয়ে তিনি নিখোঁজ হন। এ নিয়ে ৮ই মার্চ তার স্ত্রী ফাহমিদা আক্তার কলাবাগান থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরদিন মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানের একটি ঝোপের ভেতর থেকে ইমতিয়াজের লাশ উদ্ধার হয়। আইনি প্রক্রিয়া শেষে ৯ই মার্চ পুলিশ মরদেহ আঞ্জুমান মুফিদুলে হস্তান্তর করে। এরপর বেওয়ারিশ হিসেবে মুন্সীগঞ্জ পৌর এলাকার কবরস্থানে ওই মরদেহ দাফন করা হয়। তবে ইমতিয়াজের পরিবার তা জানতে পারেনি। নিখোঁজের ১০ দিন পর পরিবার খুন হওয়ার বিষয়টি জানতে পারে। আর সিরাজদিখানে যে ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার হয়েছে সেটি ইমতিয়াজের। পরে আদালতের অনুমতিতে ওই লাশ উদ্ধার করে শনাক্ত করেন তার স্বজনেরা।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, গ্রেপ্তার সবাই সমকামী ও তৃতীয় লিঙ্গের সদস্য। তারা একটি গে চ্যাটিং অ্যাপসের মাধ্যমে সমকামী বিভিন্ন লোকজনকে টার্গেট করে রুম ডেটের কথা বলে বাসায় ডেকে নেয়। পরে তাদের ব্ল্যাকমেইল করে মারধরের মাধ্যমে আদায় করা হয় টাকা। দীর্ঘদিন ধরে তারা এভাবে বিভিন্ন কায়দায় ব্ল্যাকমেইল করে টাকা হাতাচ্ছিল। নিহত ইমতিয়াজও তাদের একই ব্ল্যাকমেইলের শিকার। তার সঙ্গে আলিফের গে চ্যাটিং অ্যাপসের মাধ্যমে সম্পর্ক তৈরি হয়। তার সূত্র ধরে গত ৭ই মার্চ দুপুরে আলিফকে ফোন করে ইমতিয়াজ। আলিফ তাকে কলাবাগান থানার ক্রিসেন্ট রোডের আরাফাতের বাসায় যেতে বলে। ওইদিন ইমতিয়াজের বিবাহবার্ষিকী ছিল। সন্ধ্যার পর স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে রেস্টুুরেন্টে খাবার খাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নকশা প্রিন্ট করানোর কথা বলে দুপুরের দিকে বাসা থেকে বের হয়ে যান ইমতিয়াজ। এরপর আর ফিরে আসেননি। ডিবি জানায়, ইমতিয়াজের মরদেহ ফেলে দিয়ে আলিফকে বাসাবো, আনোয়ারকে গ্রীন রোডে নামিয়ে দিয়ে আরাফাত, মেঘ ও মুন্না প্রথমে নারায়ণগঞ্জ পরে চাঁদপুর, মুন্সীগঞ্জ ও কুমিল্লা হয়ে ব্রাক্ষণবাড়িয়ার আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে পালিয়ে যায়। ভারতে আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করে অভিযান চালায় দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরে আসামিরা ওই স্থান থেকে পালিয়ে পুনরায় অবৈধভাবে একই পথে বাংলাদেশে ফিরে আসে। এরপর ডিবি পুলিশের অভিযানে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, চক্রটি এভাবে সমকামী ডেটিং অ্যাপের ফাঁদে ফেলে বহু মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত আরাফাত আর আলিফ পালিয়ে গেছে ভারতে। তাদের ফিরিয়ে আনতে কাজ চলছে।
আমাদের কাগজ/টিআর





















