আন্তর্জাতিক ৪ জানুয়ারি, ২০২৬ ১১:২৮

অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজলভ: যেভাবে বন্দি হলেন মাদুরো

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সিআইএ গত আগস্ট থেকেই ভেনিজুয়েলার ভেতরে একটি গোপন দল মোতায়েন করেছিল। তাদের একমাত্র কাজ ছিল মাদুরোর প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর নজর রাখা। মার্কিন গোয়েন্দারা জানতেন মাদুরো কখন ঘুমান, কী খান, এমনকি তার প্রিয় পোষা প্রাণীদের অবস্থানও ছিল তাদের নখদর্পণে

কয়েক মাসের পরিকল্পনার পর ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করেছে যুক্তরাষ্ট্র। শনিবার ভোরে কারাকাসে চালানো এক বিশেষ অভিযানে মার্কিন ডেল্টা ফোর্স মাদুরোর বাসভবনে ঢুকে তাকে সস্ত্রীক আটক করে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফ্লোরিডার মার-আ-লাগো রিসোর্ট থেকে পুরো অভিযান সরাসরি দেখেছেন।

'অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজলভ' নামের এই মিশনের নীল নকশা তৈরি হয়েছিল অন্তত চার মাস আগে। গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ গত আগস্ট থেকেই ভেনিজুয়েলার ভেতরে একটি গোপন দল মোতায়েন করেছিল। তাদের একমাত্র কাজ ছিল মাদুরোর প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর নজর রাখা। মার্কিন গোয়েন্দারা জানতেন মাদুরো কখন ঘুমান, কী খান, এমনকি তার প্রিয় পোষা প্রাণীদের অবস্থানও ছিল তাদের নখদর্পণে। সূত্রের খবর, ভেনিজুয়েলা সরকারের উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তাকে সিআইএ তাদের সোর্স হিসেবে ব্যবহার করেছিল, যার পাঠানো তথ্যে এই অভিযান নিখুঁতভাবে পরিচালিত হয়।


ট্রাম্পের ‘আল্টিমেটাম’ এবং অভিযানের সবুজ সংকেত
নভেম্বরে ট্রাম্প ও মাদুরোর মধ্যে একটি গোপন ফোনকল হয়েছিল। ট্রাম্প সরাসরি মাদুরোকে দেশ ছাড়ার আল্টিমেটাম দিয়ে বলেন, ‘আপনার মঙ্গলের জন্যই বলছি, পদত্যাগ করুন।‘ মাদুরো সেই প্রস্তাবকে গুরুত্ব দেননি। ক্রিসমাসের ঠিক আগে ট্রাম্প এই অভিযানের চূড়ান্ত অনুমতি দেন। যদিও ভেনিজুয়েলার দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া এবং নাইজেরিয়ায় অন্য একটি অভিযানের কারণে দেরি হচ্ছিল। অবশেষে স্থানীয় সময় শুক্রবার রাত ১০টা ৪৬ মিনিটে ফ্লোরিডায় নৈশভোজ শেষ করে ট্রাম্প কমান্ডোদের উদ্দেশে বলেন, ‘গুড লাক অ্যান্ড গডস্পিড।‘

যেভাবে পরিচালিত হলো ‘অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজলভ’
অভিযান শুরু হতেই ২০টি ভিন্ন মার্কিন ঘাঁটি থেকে ১৫০টিরও বেশি যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার আকাশে ওড়ে। রাডার ফাঁকি দিতে হেলিকপ্টারগুলো সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১০০ ফুট ওপর দিয়ে উড়ে কারাকাসে পৌঁছায়। মার্কিন সাইবার কমান্ডের মাধ্যমে কারাকাসের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও যোগাযোগ মাধ্যম সম্পূর্ণ বিকল করে দেয়া হয়।

রাত ২টা ১ মিনিটে ডেল্টা ফোর্সের কমান্ডোরা দড়ি বেয়ে মাদুরোর বিলাসবহুল কম্পাউন্ডে নামেন। এসময় রক্ষীদের সঙ্গে প্রচণ্ড গোলাগুলি হয়। একটি মার্কিন হেলিকপ্টার গুলিতে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সেটি উড়তে সক্ষম ছিল। মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস গোলমালের শব্দ পেয়ে 'সেফ রুমে' পালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তার স্টিলের ভারী দরজা বন্ধ করার আগেই কমান্ডোরা সেখানে পৌঁছে যান। আত্মসমর্পণে বাধ্য হন মাদুরো ও তার স্ত্রী।

আটকের পর নিউইয়র্কে ‘ধরে আনা’
আটকের পর মাদুরোকে ধূসর সোয়েটপ্যান্ট এবং চোখে বিশেষ কালো চশমা পরিয়ে হেলিকপ্টারে তোলা হয়। প্রথমে তাদের মার্কিন যুদ্ধজাহাজ 'ইউএসএস ইও জিমা'-তে নেয়া হয়। সেখান থেকে কিউবার বিতর্কিত গুয়ান্তানামো বে কারাগার হয়ে শনিবার সন্ধ্যায় তাদের নিউইয়র্কের স্টুয়ার্ট এয়ার ন্যাশনাল গার্ড বে’তে নিয়ে আসা হয়। বর্তমানে মাদুরো ব্রুকলিনের মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে বন্দি রয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।

অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ও ট্রাম্পের ঘোষণা
অভিযান শেষে ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে, এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলা ‘পরিচালনা’ করবে এবং দেশটির তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেবে। তিনি মাদুরোকে আটকের এই দৃশ্যকে ‘টেলিভিশন শো দেখার মতো’ রোমহর্ষক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। মার্কিন কংগ্রেসের অনেক সদস্য এই অভিযানের দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তার আমলে যুক্তরাষ্ট্রের জেতার রেকর্ড শতভাগ।

কারাকাসের রাস্তাগুলো এখন জনশূন্য, বাতাসে বারুদের গন্ধ আর জনমনে চরম আতঙ্ক। ভেনিজুয়েলার ক্ষমতা এখন কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে রয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা।