নিজস্ব প্রতিবেদক: বগুড়া জেলা ছাত্রলীগের মিছিলে কেউ কোনোদিন তাকে 'জয় বাংলা' স্লোগান দিতে দেখেননি। ছিলেন না কোনো মাঠের কর্মসূচিতেও। স্বাভাবিক কারণে স্থানীয় নেতাকর্মীরা তার চেহারাটা পর্যন্ত চেনেন না। অথচ আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতোই জেলার সাধারণ সম্পাদকের পদটি জয় করে নিয়েছেন। জয় করা মানুষটির নামও আল মহিদুল ইসলাম জয়।
কমিটিতে সভাপতির পদ বাগিয়ে নেওয়া সজীব সাহার গল্পটাও একই ধরনের। আগের কমিটিতে তিনি ছিলেন গণশিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক। দলে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তার জোরালো অংশগ্রহণের চাইতে জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মজিবর রহমান মজনুর ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবেই তাকে বেশি চেনে মানুষ। এছাড়া শহরের মানিকচকে বাবার আটা-ময়দার ব্যবসাও দেখাশোনা করেন তিনি। ব্যবসায়ী এই সজীব এখন নতুন ঘোষিত জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি।
সাত বছর পর গত সোমবার বগুড়া জেলা ছাত্রলীগের আংশিক কমিটির নেতাদের অবয়ব দেখে ত্যাগী নেতাকর্মীরা সংক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। শুধু তাই নয়, নানা ফন্দিফিকির করে ওই কমিটিতে জায়গা করে নিয়েছেন মাদক ব্যবসায়ী, মাদক সেবনকারী, ছাত্রদল থেকে আসা হাইব্রিড নেতা, যুবলীগে সুবিধা করতে না পারা নেতাসহ ডাকাতি মামলার আসামিও। অথচ দিনরাত মাঠে ঘাম ঝরানো ত্যাগী অনেক নেতাই বঞ্চিত হয়েছেন তাঁদের প্রাপ্যপদ থেকে। অভিযোগ উঠেছে, কেন্দ্রীয় নেতারা কমিটি গঠনে দলীয় সংবিধান ও প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া নির্দেশনা মানেননি।
সোমবার রাতে কেন্দ্র থেকে আংশিক ঘোষিত এই কমিটিতে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ ৩০ জনের নাম রয়েছ। তবে কেন্দ্রের এই ঘোষণা স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেননি স্থানীয় নেতাকর্মীরা। রাত থেকেই বগুড়া শহরের টেম্পল সড়কে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে জড়ো হন বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা। ওই ভবনে ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগের অঙ্গ-সহযোগী সব সংগঠনের কার্যালয় অবস্থিত। বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা কমিটি প্রত্যাখ্যান করে ওই ভবনের ফটকে তালা লাগিয়ে দেন। কার্যালয়ের সামনে টেম্পল সড়কে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে স্লোগান দেওয়া হয়।
মঙ্গলবার দিনব্যাপী চলেছে এই বিক্ষোভ কর্মসূচি। সেখানে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মজিবর রহমান মজনুর বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধরা নানা স্লোগান দিতে থাকেন।
বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেন, টাকার বিনিময়ে বিতর্কিত ব্যক্তিদের জেলা ছাত্রলীগের কমিটি করা হয়েছে। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো বিক্ষোভকারীদের মধ্যে নতুন কমিটিতে পদ পাওয়া বেশ কয়েকজন নেতাও রয়েছেন। এরমধ্যে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের পদ পাওয়া মাহফুজার রহমান বলেন, 'আমরা মাঠে থেকেছি। অথচ যাদের চেহারা কখনও নেতাকর্মীরা দেখেনি, তাকে সাধারণ সম্পাদকের পদ দেওয়া হয়েছে। সে ঢাকায় পড়াশোনা করে। কেন্দ্রের কিছু নেতার সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে। এটি কোনো যোগ্যতা হতে পারে না।' একই ধরনের মন্তব্য করেছেন নতুন কমিটিতে সহসভাপতি পদ পাওয়া সিদ্ধার্থ কুমার দাস, রাকিবুল হাসান, নুর মোহাম্মদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদ পাওয়া আহসান হাবীব।
বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ওবায়দুল্লাহ সরকার, শহর ছাত্রলীগের সভাপতি সঞ্জিত কুমার দাস এবং তাঁদের অনুসারীরা রয়েছেন। এই কমিটি প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা বিক্ষোভ চালিয়ে যাবেন বলে জানান।
কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তি সূত্রে জানা যায়, সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ছাড়া সহসভাপতি পদ পেয়েছেন ১৭ জন। তাঁরা হলেন- তৌহিদুর রহমান, মিথিলেস কুমার, রাকিবুল হাসান শাওন, সাজ্জাদ আলম, নুর মোহাম্মদ, মুকুল ইসলাম, শেখ হৃদয়, আতিকুর রহমান, রায়হান কবীর, তোফায়েল আহমেদ, সিদ্ধার্থ কুমার দাস, শামিমা সুমি, জাহিদ হাসান, আল আমিন হোসেন পাপ্পু, অনুরাগী তিশা, সবুজ বিশ্বাস ও রাকিবুল হাসান।
যুগ্ম সম্পাদক পদ পেয়েছেন ৫ জন। মাহফুজার রহমান, রাকিবুল হাসান, মিনহাজুল ইসলাম সজল, আহসান গালিব ও আহসান হাবীব। সাংগঠনিক সম্পাদক পদ পেয়েছেন ৬ জন আল নোমান সাব্বির, আল ইমরান হোসেন, নয়ন অধিকারী, বজলুর রহমান, রিয়াজ মাহমুদ রক্সি ও সুজন আকন্দ।
ছাত্রলীগের বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা জানান, বগুড়া ছাত্রলীগের ঘোষিত কমিটির সাধারণ সম্পাদক আল মাহিদুল ইসলাম জেলা ছাত্রলীগের সদস্য নন। জেলা ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডে কখনও অংশও নিতে দেখেননি কেউ। তিনি আদমদীঘি উপজেলার বাসিন্দা। থাকেন ঢাকায়। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি আল-নাহিয়ান খানের সঙ্গে সখ্য থাকায় তিনি পদ বাগিয়েছেন। সাংগঠনিক সম্পাদক পদ পাওয়া ইমরান হোসেন আগে ছাত্রদলের রাজনীতি করতেন। তাঁর বাড়ি গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জে।
একই পদ পাওয়া বজলুর রহমানকে কেউ কখনও ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডে দেখেননি। রিয়াজ মাহমুদ রক্সি নামের ছাত্রনেতাকে কেউ চিনতেই পারছেন না। তাকে এখন খোঁজা হচ্ছে বলে জানান তাঁরা। নতুন কমিটির সহসভাপতি আল আমিন হোসেন পাপ্পু একটি ডাকাতি মামলার আসামি। সে সময় পত্রিকায় গণপিটুনি খাওয়ার ছবিও ভাইরাল হয় তার। ছাত্রদল থেকে ক্ষমতার লোভে ছাত্রলীগে যোগ দেওয়া এই নেতা ডাকাতি মামলায় জেলও খেটেছেন। সহসভাপতি শামিমা সুমির বিরুদ্ধে রয়েছে সমকামিতার অভিযোগ। এ কারণে পুলিশের হাতে তিনি আটক হন। শিক্ষকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বহিস্কৃত নেতা আতিকুর রহমান পেয়েছেন সহসভাপতি পদ।
আরেক সহসভাপতি শেখ হৃদয় ছাত্রদল থেকে ছাত্রলীগে এসে মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। যুগ্ম সম্পাদক আহসান গালিব প্লাবন মদ পান করে মাতলামি করার সাক্ষী অনেকেই। সাংগঠনিক সম্পাদক নয়ন অধিকারী আগে যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে ছিলেন। এখন এসে ছাত্রলীগের গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়ে গেছেন। এ রকম আরও অনেক নেতাই রয়েছেন যাঁদের চেনেন না স্থানীয় নেতাকর্মীরা।
বগুড়া ছাত্রলীগের কমিটির ব্যাপারে সাবেক সভাপতি নাইমুর রাজ্জাক বলেন, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দু'জনই জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মজিবর রহমানের অনুসারী। হয়তো এ কারণে যোগ্যতার বিবেচনা করা হয়নি। দলে অনেক যোগ্য ছেলে ছিল। স্বাভাবিক কারণেই অনেকের মন ভেঙে যাবে। সংগঠন করতে চাইবে না।
সভাপতি পদপ্রত্যাশী ছিলেন মুকুল হোসেন। পদবঞ্চিত হয়ে হয়েছেন ৬নং সহসভাপতি। এরপরই তিনি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। লিখেছেন, ভালোবাসার সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ থেকে বিদায়।
প্রায় দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে জেলা ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রণ করছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের দুই শীর্ষ নেতা। তাঁদের একজন জেলার প্রয়াত সভাপতি মমতাজ উদ্দিন এবং অন্যজন হলেন যুগ্মসম্পাদক মঞ্জুরুল আলম মোহন। এই দুই নেতার সুপারিশক্রমেই বিগত সময়গুলোতে বগুড়া জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক পদ নির্ধারণ করতেন কেন্দ্রের নেতারা। মূলত ছাত্রলীগের ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রকাশ করতেই কমিটি গঠনে হস্তক্ষেপ ছিল তাদের। মমতাজ উদ্দিন মারা যাওয়ার পর আওয়ামী লীগ সভাপতি মজিবর রহমান মজনু নিয়ন্ত্রন নেন এক পক্ষের। অন্যপক্ষ চলে যায় সাধারণ সম্পাদক রাগিবুল আহসান রিপু ও যুগ্ম সম্পাদক মঞ্জুরুল আলম মোহনের কাছে। বিভিন্ন সময় এই নেতাদের সঙ্গে বাড়িতে, গাড়িতে, অনুষ্ঠানে ও ভ্রমণকালে সেলফি তুলে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেন অনেকে। এবার ঘোষিত কমিটিতে সভাপতি ও সম্পাদক মজনু গ্রুপ থেকে হওয়ার কারণে ক্ষুব্ধ হয়েছেন অনেকেই।
২০১৫ সালের ৭ মে বগুড়া জেলা ছাত্রলীগের সর্বশেষ সম্মেলন হয়। ওই বছর ১২ মে আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। ২০১৬ সালের ২৫ ডিসেম্বর ঘোষণা করা হয় পূর্ণাঙ্গ কমিটি। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, ছাত্রলীগের জেলা কমিটির মেয়াদ এক বছর। তবে সাত বছর পরও সম্মেলন না হওয়ায় প্রায় স্থবির সাংগঠনিক কার্যক্রম। পরে ২ ফেব্রুয়ারি শহীদ টিটু মিলনায়তনে কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে ৫৬ নেতা জীবনবৃত্তান্ত জমা দেন। সেখানে দ্রুত কমিটি গঠনের আশ্বাসও দেন নেতারা। ৯ মাস পর যে কমিটি ঘোষণা হলো তা নিয়ে ক্ষোভের অন্ত নেই।
জানতে চাইলে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মজিবর রহমান মজনু বলেন, 'সবার মন রক্ষা করা সম্ভব নয়। অনেকেই তদবির করেছে। কেন্দ্র যাকে যোগ্য মনে করেছে তাকে দায়িত্ব দিয়েছে। এখানে বিক্ষোভ করা বা কাউকে দোষ দেওয়ার কিছু নেই। এছাড়া কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সেটি তদন্ত করে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতারা ব্যবস্থা নেবে।'
আমাদের কাগজ/টিআর



















