গোলাম রাব্বানী
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই কালরাত্রিতে শুধু একটি পরিবারকে হত্যা করা হয়নি, হত্যা করা হয়েছিল একটি জাতির হৃদস্পন্দনকে।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার বন্ধ ছিল ২১ বছর। আর এই দীর্ঘ সময়ে জিয়াউর রহমানের শাসন এবং খালেদা জিয়ার বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কজনক এ হত্যাকাণ্ডের বিচার কার্যক্রম শুধু বন্ধই করেনি ; বরং জিয়া-খালেদা সরকার বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পুনর্বাসিত করেছে।
জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকাবস্থায় বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোতে চাকরি এবং পদোন্নতির ব্যবস্থা করেছিল। বিএনপি জোট ক্ষমতায় থাকাকালেও ঘাতকদের ও তার পরিবারের সদস্যদের রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়। শুধু ঘাতকদের আশ্রয় দেওয়াই হয়নি বরং ঘাতকদের পরিবারের সদস্যদের সরকারের গুরুত্বপুর্ন বিভাগে চাকরি দেওয়া হয়।
১৯৭৬ সালের ৮ জুন বঙ্গবন্ধুর খুনিদের মধ্যে উল্লিখিত ১২ জনকে বিদেশে বাংলাদেশের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দেয়া হয়েছিল-
১. শরিফুল হক ডালিম (মেজর ডালিম), চীনে প্রথম সচিব।
২. আজিজ পাশা, আর্জেন্টিনায় প্রথম সচিব।
৩. একেএম মহিউদ্দিন আহমেদ, আলজেরিয়ায় প্রথম সচিব।
৪. বজলুল হুদা, পাকিস্তানে দ্বিতীয় সচিব।
৫. শাহরিয়ার রশীদ, ইন্দোনেশিয়ায় দ্বিতীয় সচিব।
৬. রাশেদ চৌধুরী, সৌদি আরবে দ্বিতীয় সচিব।
৭. নূর চৌধুরী, ইরানে দ্বিতীয় সচিব।
৮. শরিফুল হোসেন, কুয়েতে দ্বিতীয় সচিব।
৯. কিসমত হাশেম, আবুধাবিতে তৃতীয় সচিব।
১০. খায়রুজ্জামান, মিসরে তৃতীয় সচিব।
১১. নাজমুল হোসেন আনসার, কানাডায় তৃতীয় সচিব।
১২. আবদুল সাত্তার, সেনেগালে তৃতীয় সচিব।
খুনিদের নিয়োগপত্র ঢাকা থেকে লিবিয়ায় পৌঁছে দিয়েছিলেন শমসের মবিন চৌধুরী। এর আগে ওই বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ মাসে তাদের সঙ্গে আলোচনা-সমঝোতার জন্য তৎকালীন মেজর জেনারেল নুরুল ইসলাম শিশু লিবিয়ায় গিয়েছিলেন।
১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বরে জিয়াউর রহমানের নির্দেশে ফরেন সার্ভিস ক্যাডারে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া হয়। তবে উল্লিখিত ১২ সেনা কর্মকর্তা ফরেন সার্ভিসে যোগ দিতে রাজি হলেও প্রধান দুই হোতা ফারুক ও রশীদ জিয়ার সঙ্গে সমঝোতা করে চাকরি না নিয়ে ব্যবসা করার মনস্থির করেন।
বঙ্গবন্ধুর খুনিদের স্বার্থরক্ষার জন্য জিয়া-খালেদা সরকার রীতিমতো প্রতিযোগিতায় মত্ত থেকেছে। প্রয়াত বেনজির ভুট্টো সরকার পাকিস্তানে খুনি মহিউদ্দিন আহমেদকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালেও সৌদি সরকার এ খুনিকে সৌদি আরবে বাংলাদেশের মিশন উপপ্রধান হিসেবে গ্রহণ করেছে। কিসমত হাশেম ও নাজমুল হোসেন আনসার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চাকরি ছেড়ে কানাডার নাগরিকত্ব নিয়েছিল।
বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার প্রথম আমলে (১৯৯৬-২০০১) খায়রুজ্জামান জেল খাটলেও বিএনপি-জামায়াত জোট আমলে জেল থেকে বের হয়ে মিয়ানমার ও মালয়েশিয়ায় রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেছে। দেশরত্ন শেখ হাসিনার মহাজোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই খায়রুজ্জামান পলাতক।
এই খায়রুজ্জামান মালয়েশিয়ায় রাষ্ট্রদূত থাকাকালীন মালয়েশিয়া বাঙালিদের জন্য কলিং ভিসা বন্ধ করে দেয়। বাংলাদেশ দূতাবাসের সামনে হাজার হাজার বাঙালি অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন।এ ছাড়া খুনি আজিজ পাশার মৃত্যুর পর তার পরিবারকে যাবতীয় সরকারি সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার।
বঙ্গবন্ধুর যে খুনিদের জিয়া-খালেদা প্রতিপালন করেছে পরম মমতায়, সেই খুনিদেরই একটি অংশ ১৯৮০ সালের ১৭ জুন সেনানিবাসের অভ্যন্তরে একটি অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা চালায়। সেই সময়ে মেজর ডালিম-নূর-হুদা-আজিজ পাশাদের গ্রেফতার করা হয়েছিল। পরে আবার মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেয়া হয় তাদের।
মেহনাজ ও ব্রিগেডিয়ার বারির বদৌলতে সরকারের বিশেষ সংস্থার আসল চরিত্র উন্মোচিত হলেও এ প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা ১৯৮৩ সালে আরও একবার উন্মোচিত হয়েছিল।
আশির দশকে খুনি ফারুক-রশীদ ‘মুক্তির পথ’ নামে একটি চটি বই লিখেছিল, বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে বিনে পয়সায় সেই বই বিতরণ করা হয়। এভাবেই বঙ্গবন্ধুর খুনিদের আদর্শিক কায়দায় পুনর্বাসিত করার অপচেষ্টা নিয়েছিল রাষ্ট্রীয় সংস্থাটি। এর পরের ইতিহাস আরও করুণ।
১৯৮৬ সালের নির্বাচনে খুনি ফারুক রহমান রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। বলতে গেলে সেটিই ছিল বঙ্গবন্ধুর খুনিচক্রের প্রথম এক্সপোজার।
বস্তুত আওয়ামী লীগকে দমন করার জন্য এই অপশক্তিকে রাজনীতিতে সক্রিয় করা হয়েছিল। ১৯৮৬ সালের সংসদ নির্বাচনে খুনি বজলুল হুদাকে মেহেরপুর থেকে এমপি বানানো হয়েছিল। এই কলঙ্ক বাংলাদেশের। ১৯৯৬ সালের সাদেক আলী নির্বাচনে খুনি রশীদকে বিরোধীদলীয় নেতা মনোনীত করা হয়েছিল।
খুনিদের রক্ষার এত প্রচেষ্টার পরও হাল ছাড়েননি বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা, পিতার খুনিদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করেছেন। বাকি পলাতক খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
লেখক: গোলাম রাব্বানী, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ





















