রাজনীতি ১৭ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৯:৪৯

নাগরিক শোকসভায় বক্তারা

অন্যকে আলো দিতে, মোমবাতির মতো পুড়েছেন খালেদা জিয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক
বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মানসূচক উপাধিতে ভূষিত করার দাবি জানানো হয়েছে। খালেদা জিয়ার স্মরণে আয়োজিত নাগরিক শোকসভায় এ দাবি জানানো হয়।

বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্টজনদের মতে, দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যে সুযোগ তৈরি হয়েছে সে সুযোগকে কাজে লাগানোই হবে খালেদা জিয়ার স্মৃতির প্রতি বড় শ্রদ্ধা। তাদের মতে, উপমহাদেশের রাজনীতিতে গত একশ বছরের ইতিহাসে বেগম জিয়ার মতো জনপ্রিয় এবং আপসহীন নেত্রী বিরল।

তারা বলছেন, জনপ্রিয়তাকে সঙ্গী করেই চিরবিদায় নিয়েছেন এই নেত্রী। তবে তার চিকিৎসায় স্লো-পয়জন প্রয়োগ ও অবহেলার যে অভিযোগ, তার তদন্তে উচ্চতর কমিটি গঠনের দাবি জানান বক্তারা।


শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষির প্লাজায় আয়োজন করা হয় এ শোকসভার। এতে অংশ নেন দেশের রাজনৈতিক, সামজিক, সাংস্কৃতিক শ্রেণির নাগরিক এবং বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা।

এর আগে বেলা তিনটায় স্ত্রী জুবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান ও ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শামিলা রহমানসহ স্বজনদের নিয়ে নাগরিক সভায় যোগ দেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বক্তাদের স্মৃতিকথার মধ্য দিয়ে দেশের স্বাধীনতা স্বার্বোভৌমত্ব উন্নয়ন সমৃদ্ধিতে মায়ের অবদান আর দূরদর্শীতার কথা নীরবে শোনেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।

বক্তব্যে আমন্ত্রিত অতিথিদের কেউ তুলে ধরেন স্মৃতি কথা, কেউ তুলে ধরেন খালেদা জিয়ার দূরদর্শীতা। দেশের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়ার পথে খালেদা জিয়ার আদর্শকে ধারণ করার আহ্বান জানান বিশিষ্টজনেরা।


দেশের জন্য খালেদা জিয়ার ত্যাগকে শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করে অতিথিরা জানান, এতো প্রতিহিংসার শিকার হয়েও জীবনের শেষ সময়েও উদারতার নজির রেখে গেছেন খালেদা জিয়া। গণতন্ত্রের জন্য আমৃত্যু সংগ্রাম করে যাওয়া রাজনীতির নক্ষত্র খালেদা জিয়াকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মান জানানোর দাবি ওঠে নাগরিক শোকসভায়।

সভা শেষে উপস্থিত বিশিষ্টজনদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।


সভায় অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, ‘খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জঘন্য বিচার করেছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে বিদেশ পাঠাতে অনেক অনুনয় বিনয় করেছি৷ বেগম জিয়া ভালো থাকলে, ভালো থাকবে বাংলাদেশ। বাংলাদেশকে ভালো রাখতে হলে খালেদা জিয়াকে ইন্টারালাইজ করতে হবে।’

নাগরিক শোকসভার আয়োজন হলেও সেখানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় চরম অবহেলার বিষয়। তার চিকিৎসায় স্লো-পয়জন প্রয়োগ ও অবহেলার যে অভিযোগ, তার তদন্তে উচ্চতর কমিটি গঠনের দাবি জানানো হয়।

স্মরণসভায় বক্তারা বলেন, বেগম জিয়া ছিলেন গণতন্ত্রের এক অপরাজেয় প্রতীক। জনপ্রিয়তাকে সঙ্গী করেই তিনি পাড়ি দিয়েছেন না ফেরার দেশে। শত বছরের ইতিহাসে এমন ত্যাগী নেত্রী আর আসেনি। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনে যার অবদান ছিল অবিস্মরণীয় তার এমন মৃত্যু কোনোভাবেই কাম্য নয়।

সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছের বলেন, ‘বেগম জিয়ার আদর্শই আগামীর গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের মূল পাথেয়।’ তাই সে লক্ষ্যে উত্তরণে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠ বিচারের দাবি জানান তিনি।

ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, ‘সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে যে সাংবাদিকতা তা খালেদা জিয়ার সময় করেছি। কারাবন্দি ছিলেন, চিকিৎসা করতে দেওয়া হয়নি তারপরও ধ্বংস-প্রতিশোধ-হিংসা থেকে বের হতে খালেদা জিয়ার আহ্বান ছিল তার উদারতা।’


লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বের হতে খালেদা জিয়ার আহ্বান বাস্তবায়ন করতে পলিটিক্স অব রিকনসিলিয়েশনে যেতে হবে। অন্যকে আলো দিতে মোমবাতির মতো পুড়ে গেছেন খালেদা জিয়া।’

যায় যায় দিন সম্পাদক শফিক রেহমান বলেন, ‘আগামী দিনের তরুণ ভোটাররা চিন্তাভাবনা করে ভোট দেবেন প্রত্যাশা। যে করেই হোক বালো তারিখের নির্বাচন যেন হয়, সেটার জন্য সবার সহযোগিতার বিষয় আছে। আইন শৃঙ্খলাবাহিনী তাদের ভূমিকা রাখবে প্রত্যাশা। কোনোভাবেই ভোট বানচাল হতে দেওয়া যাবে না।’


খালেদা জিয়ার চিকিৎসক দলের প্রধান এফ এম সিদ্দিকি বলেন, ‘দীর্ঘ প্রায় বার বছর ধরে চিকিৎসা করেছি। চিকিৎসায় বিস্ময়ে দেখি ম্যাডাম লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত। পিজির প্রেসক্রাইব করা ওষুধ লিভারের ক্ষতি করছে কিনা তা নিয়মিত পরীক্ষা করার কথা ছিল; কিন্তু তখনকার সরকার নির্ধারিত চিকিৎসকরা তা করেনি। তার একটা আল্ট্রাসনো করেনি চিকিৎসকরা। খালেদা জিয়ার পছন্দের চিকিৎসক সরকারের মেডিক্যাল বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করার অনুরোধ করলেও তারা করেনি। ম্যাডামকে মিথোট্রেক্সেস ফ্যাটিলিভার সিরোসিস তৈরি করে, স্লো পয়জন হিসেবে কাজ করেছে।’

খালেদা জিয়ার চিকিৎসার অবহেলা করে ইচ্ছেকৃতভাবে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল বলেও অভিযোগ করে তিনি এ বিষয়ে উচ্চতর তদন্ত কমিটি গঠন করার আহ্বান জানান।

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী রাজা দেবাশীষ রায় বলেন, ‘খালেদা জিয়ার আগে কোনো সরকার পাহাড়ের গ্রাম পর্যায়ের সরকারকে স্বীকৃতি দেয় নি। অসাম্প্রদায়িক বহুত্ববাদী বাংলাদেশ গড়ায় তার প্রতি শ্রদ্ধা।’

আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘একশ বছরের মধ্যে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়া এই দুইজন ব্যক্তি সারাজীবন জনপ্রিয়তা নিয়ে গেছেন। দুই ব্যক্তি জনপ্রিয়তা নিয়ে রাজনীতিতে এসেছেন, জনপ্রিয়তা নিয়ে আল্লাহর কাছে চলে গেছেন। উপমহাদেশে একশো বছরের মধ্যে খালেদা জিয়ার মতো কেউ গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেনি। খালেদা জিয়ার মতো গণতন্ত্রের পতাকা যেন তারেক রহমান বয়ে যেতে পারেন।’