????????? ১৭ অক্টোবর, ২০১৯ ১০:১৯

ক্যাসিনো বিরোধী অভিযানের পাশাপাশি যুগোপযোগী আইনের প্রয়োগ কাম্য

সমাজ ও রাষ্ট্র সবসময় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। সব পরিবর্তনে রূপান্তর হয় না। যে পরিবর্তন সমাজ ও রাষ্ট্রের মৌলিক উপাদানে ঘটে সেই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে রূপান্তর হয়। এমন কিছু ঘটলে আমরা সেটাকে মোটা দাগে সমাজ বিপ্লব বা রাষ্ট্র বিপ্লব বলতে পারি। যদিও সবসময় সেটা কাঙ্ক্ষিত ফল লাভ করতে পারে না। বর্তমান সময়ে আমরা একটা রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এই রূপান্তর ঘটেছে তথ্য-প্রযুক্তিতে বিপ্লব ঘটার ফলে। সমাজতাত্ত্বিকরা এটাকে নাম দিয়েছে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব। বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কারের ফলে প্রথম শিল্প বিপ্লব ঘটেছে। দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লবের উপাদান বিদ্যুৎ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমসাময়িককালে কম্পিউটার প্রযুক্তি আবিষ্কারের ফলে তৃতীয় শিল্প বিপ্লব সংঘটিত হয়। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ঘটেছে ইন্টারনেট বা অন্তর্জাল ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে। বর্তমান সময়ে এটার সাথে ক্লাউড টেকনোলজি যুক্ত হওয়াতে সেটা নতুন মাত্রা লাভ করেছে। 

এক ধাপ থাকে আরেক ধাপে স্থিতিশীল হওয়া পর্যন্ত মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবন এক ধরনের রূপান্তর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। পাকিস্তান আমলে আমরা নিষ্পেষিত, নির্যাতিত ছিলাম। এই অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষের অনুভূতি একই রকমের ছিল। এর থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য আমরা যূথবদ্ধ সংগ্রামের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে স্বাধীন হই। এর মধ্য দিয়ে আমরা রাজনৈতিক সংগ্রামকে একটি সফল বিপ্লবে রূপ দান করতে সক্ষম হই। এই রাজনৈতিক বিপ্লবের সাথে সাথে যদি আমাদের আর্থ-সামাজিক পন্থা নির্ধারণ করতে পারতাম তাহলে নতুন রাষ্ট্রে সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার পথটা মসৃণ হতো। কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বধীন দেশে ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠী ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থ নিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। স্বার্থ হাসিলের জন্য দেশের কথা ভুলে অনেকে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর স্বার্থকে বড় করে দেখেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেখান থেকে উত্তরণের জন্য আর্থ-সামাজিক এই পন্থা নির্ধারণের লক্ষ্যে দ্বিতীয় বিপ্লবের ইশতেহার জাতির সামনে তুলে ধরেন। কিন্তু এর কিছু সময় পরে বঙ্গবন্ধু হত্যার মধ্য দিয়ে ৮০-র দশক থেকে জবাবদিহিতাহীন, অগণতান্ত্রিক স্বৈরাচারী রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাড়বাড়ন্ত লক্ষ্য করা যায়। সামরিক স্বৈরশাসকদের ডানায় ভর করে সারাদেশে ব্যক্তি স্বার্থবাদী রাজনীতি বিস্তার লাভ করে। তথ্য-প্রযুক্তির বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বহিরাঙ্গে পরিবর্তন আসলেও অন্তরঙ্গে কোন পরিবর্তন আসে নি। বরং স্বার্থের আকাঙ্ক্ষায় তথ্য-প্রযুক্তির ডানা লাগায় তার গতি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে একটি শ্রেণি অতি দ্রুত ধনী হয়ে উঠেছে। বিপরীতে অন্য একটি শ্রেণি আরো নিঃস্ব হচ্ছে। অর্থাৎ অন্যকে ঠকানো বা বঞ্চিত করার পন্থাও বেড়েছে। ২৬ সেপ্টেম্বর দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান টিআইবি এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ঘুষ না দিলে সেবা পাবেন না এমনটি মেনেই নিয়েছেন দেশের ৮৯ শতাংশ মানুষ। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো সবচেয়ে বেশি ঘুষ দিতে হয় সরকারী সনদ অর্থ্যাৎ জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট ও জন্মনিবন্ধন নিতে। তবে ৭৫ শতাংশ মানুষ ঘুষ দেয়াটা মেনে নিলেও বাকি ২৫ শতাংশ মানুষ অভিযোগ করেন। তবে অভিযোগ করলে লাভের চেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি। এটাকে আমাদের অনেকে বলে এদেশে সিস্টেম কাজ করে না। মূলকথা হলো, সিস্টেম কাজ করছে ঠিকই। যেভাবে সিস্টেম গড়ে তোলা হয়েছে সিস্টেম সেভাবে কাজ করছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, দুর্নীতিপরায়ণ একটা সামাজিক মন আমাদের সমাজের কত গভীরে প্রোথিত হয়েছে। একজন নাগরিকের জাতীয় পরিচয়পত্র গ্রহণে যদি ঘুষ লাগে তাহলে সে কিভাবে রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব পালনের স্পৃহা পাবে? যে শিশুর জন্মনিবন্ধনে ঘুষ লাগে বড় হতে হতে সে কোথায় ঘুষের হাত থেকে মুক্তি পাবে?

দীর্ঘকাল (প্রায় দেড় দশক ধরে) দেশ সামরিক শাসকদের কবলে থাকায় গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে নাই। যে কারণে আইনের শাসনের ব্যত্যয় ছিল। আইনের প্রয়োগ ও তার কার্যকারিতার প্রতি আস্থা না দেখানোতে আইনের প্রতি বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিগোচর হয় নি। কিছুদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান, বিশিষ্ট সমাজ বিজ্ঞানী এ আই মাহাবুব উদ্দীন আহমেদ এক সাক্ষাতকারে বলেছেন- অকার্যকর আইন টিকিয়ে রাখা অর্থহীন। আমি বলবো শুধু অর্থহীনই না বরং এইসব আইন আমাদের আইন ভাঙতে এক ধরনের সহায়ক হিসাবে কাজ করে। সমাজ বদলের ফলে নিয়মনীতি বা রীতিনীতির বদল ঘটেছে। সঙ্গতি রেখে আইনের বদলটাও জরুরি ছিল। আইন না বদলানোতে বর্তমানে সেটা অকার্যকর হওয়ার কারণে মানুষ তা লংঘন করছে। এভাবে অকার্যকর আইন লংঘন করতে করতে মানুষ কার্যকর আইন লংঘনেও অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে আইনের শাসন কায়েম করাটা কষ্টসাধ্য হয়ে যায়। ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেছেন। এবার  আইন ও ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠার লড়াই শুরু করেছেন দুর্বৃত্তায়ন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে।

সকালে ঘর থেকে বের হয়ে আইনের লংঘন শুরু হয় আমাদের নাগরিক জীবনে। ঘরে ফেরত আসতে আসতে মনে হতে পারে আইন লংঘনটাই এখানে নিয়ম। আইন অমান্যের এই ব্যবস্থাপনায় এদেশে শেষ পর্যন্ত হাতের মুঠোয় নিজের জীবনটা নিয়ে ঘরে ফেরাটাই আসল উদ্দেশ্য। আমদের আইন ব্রিটিশ উপনিবেশের লিগ্যাসি বহন করছে। যৌক্তিকভাবে এই আইনকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে সময়োপযোগী করে তুলতে না পারলে এই আইনি কাঠামোতে কোন তাত্ত্বিক আলোচনাই ফলপ্রসূ হবে না। আইনে ফাক-ফোকর, দুর্বৃত্ত ও দুর্নীতির সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রাজধানী শহরে গড়ে উঠেছিল ক্যাসিনো সংস্কৃতি। দুর্নীতি, আইনের লংঘন ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন একসূত্রে পরিপুষ্ট। সাম্প্রতিক সময়ে পরিচালিত অভিযান এই বিষফোঁড়া নির্দিষ্ট করেছে। রাষ্ট্র ও সমাজের হৃৎপিণ্ডে বড় ধরনের ক্ষত প্রকাশ্যে চলে এসেছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে উঠেছে ক্যাসিনো সংস্কৃতি। দুর্বৃত্তায়ন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে সরকার। শুধু অভিযানে এগুলোকে সমূলে উৎপাটন করা যাবে বলে আমি মনে করি না। এগুলোর পাশাপাশি দরকার আইনি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনার। আইনি বিষয়গুলোকে যুগোপযোগী করে প্রণয়ন করা। তথ্য-প্রযুক্তির এই সময়ে অপরাধ দমনে নতুন আইনের প্রণয়নের পাশাপাশি পুরাতন আইনগুলোকে নবায়ন করা জরুরি। অপরাধ ও অপরাধী চক্রের সক্ষমতাকে প্রতিহত করার জন্য আইনের সক্ষমতা বৃদ্ধি জরুরী। লক্ষ্যণীয়, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রথম তৈরি হয় ২০০৬ সালে। তখন শাস্তির মেয়াদ ছিল কম, কিন্তু দিনে দিনে  অপরাধ বেড়ে যাওয়ায় ২০১৩ সালে এবং সর্বশেষ ২০১৮ সালে শাস্তি বাড়িয়ে আর কঠিন করা হয়। কিন্তু তাহাতে যে অপরাধ কমে নাই বরং বেড়েছে তা বর্তমান এই অভিযানে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ক্যাসিনো সংস্কৃতি গড়ে ওঠায় আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক কাজ করেছে। তথ্য-প্রযুক্তির বিকাশে দেশীয় দুর্বৃত্তরা দেশে ও বিদেশে তাদের জাল বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে। এতে দেখা যাচ্ছে দেশী ও আন্তর্জাতিক চক্রের সম্মিলিত প্রয়াসে শক্তিশালী হয়ে উঠছিল দুর্বৃত্তপনার এই অপসংস্কৃতি। শুধু সাইবার অপরাধ নয়, সামগ্রিক অপরাধের হার বেড়ে যাওয়ায় প্রমাণিত যে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগ ও নজরদারি হচ্ছে না। কিন্তু নতুন সময়ে নতুন আঙ্গিকের অপরাধ দমনে যুগোপযোগী আইনের প্রয়োগ আমরা দেখতে চাই।

সায়েম খান
রাজনৈতিক কর্মী।