??????? ৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০৩:৫৪

শেখ হাসিনা তাঁরটা করেছেন, এখন মোদির পালা

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ভারত সফর শেষ করে দেশে ফিরেছেন। ভারতে বিশ্ব অর্থনেতিক ফোরামের সামিটে যোগদানের পাশাপাশি ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে বৈঠক করেছেন। বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় নয়াদিল্লীর হায়দরাবাদ হাউজে। ঐ বৈঠকে ৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়। এছাড়া দুই দেশের সরকার প্রধানরা ৩টি যৌথ প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। ভারত বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী দেশই শুধু নয়, দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ও সক্ষমতাগত সকল বিষয়ে প্রভাবশালী বড় রাষ্ট্র। ভারতের মতো একটি আঞ্চলিক মোড়ল রাষ্ট্রের পার্শ্ববর্তী দেশ হিসাবে বাংলাদেশের মতো একটি ক্ষুদ্র তবে উদীয়মান দেশের সরকারকে সবসময় বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ চাপের মধ্যে থাকতে হয়। ভারতের মতো পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রকে নিজের সার্বভৌমত্ব প্রদর্শনটা যেমন জরুরি তেমনি সার্বভৌমত্ব প্রদর্শনের ভাবটা যেন উগ্রভাবে প্রকাশ না পায় ( যা শত্রুভাবাপন্নতার সামিল) সেদিকও লক্ষ্য রাখতে হবে। স্বাভাবিকভাবে সকল ক্ষেত্রেই ভারত আমাদের বড় অংশীদার। পার্শ্ববর্তী দেশ হওয়ার কারণে ভারতের সাথে কোন চুক্তি হলে আমাদের দেশের মানুষ আশঙ্কার জায়গা থেকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করে। কিছু কিছু সময় যে আশঙ্কাটা অমূলক নয় একথাও সত্য। আমাদের সরকারবিরোধী শক্তি ও সংবাদ মাধ্যমগুলো জনগণের এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি খেয়াল রেখেই চুক্তিগুলো বিশ্লেষণ করে। সাধারণ মানুষের উদ্বেগ রয়েছে সত্য, তবে তারা তলিয়ে ভাবতে চায় না। তাই তার উদ্বেগকে মতামতে পরিণত করতে সংবাদ মাধ্যমগুলো কাজ করে। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এইগুলো প্রচারের মাধ্যমে একটা হাইপ সৃষ্টি করা হয়। ভারতের মতো পার্শ্ববর্তী দেশের সাথে কোন চুক্তিতে আমাদের তিনটা ধাপ খেয়াল করা উচিত। যথা- ১) ভারত যেহেতু সহজে ছাড় দিতে চাইবে না তাই সুযোগ বুঝে নিজের লাভটা তুলে এনে বাস্তবায়নের চেষ্টায় এগিয়ে থাকা। যেটা করা একটু দুষ্কর। ২) উইন-উইন সিচুয়েশনে থাকা। স্বাভাবিক নীতিতে এমনটাই হওয়ার কথা। ৩) আমাদের জিত না হলেও যাতে ঠকে না যাই সে দিকটায় লক্ষ্য রাখা। প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরে আমার বিবেচনায় ৩ নং ধাপটা পরিলক্ষিত। এই সফরে বাংলাদেশের বিশাল কোন অর্জন হয়তো নেই। তবে বাংলাদেশ কিছু খুইয়ে এসেছে, এটাও সত্য নয়। বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হওয়ার কিছুদিন পর থেকেই আমাদের দেশে ভারতবিরোধী একটি শক্তি কাজ করেছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর এই শক্তিটি একটা রাজনৈতিক প্লাটফর্ম তৈরি করে। একেবারে শুরু থেকেই আওয়ামী লীগের আমলে কোন চুক্তি হলেই সেটাকে  দেশ বিক্রির চুক্তি বলে অবিহিত করা হচ্ছে। ১৯৯৬ এবং ২০০৮ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর ভারত ইস্যুতে এই ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্য আরো জোরালো হতে থাকে। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের এ ধরনের সংবাদের প্রতিক্রিয়ায় উঠে এসেছে যে, আওয়ামী লীগ যদি প্রতিবার দেশ বিক্রির চুক্তি করে, তাহলে বাংলাদেশ এখনও টিকে আছে কীভাবে? বরং তথ্য-উপাত্ত বলে নিজের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আওয়ামী লীগই আদায় করেছে বেশি।  ৭৫-র পর সামরিক শাসকদের সময় ভারতবিরোধী রাজনীতির প্লাটফর্ম তৈরি হলেও তথ্য-উপাত্তে এরাই ভারতের প্রতি বেশি নতজানু ছিল। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের আমলে ভারত ‘দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ’ দখল করে এর নামকরণ করে ‘পূর্বাশা দ্বীপ’। তখন বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কোন প্রতিবাদ জানানো হয় নি। অথচ আওয়ামী লীগের ৯৬-এর আমলে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি হয়। ২০০৮-এ ক্ষমতায় আসার পর ২০১৪ সালের জুলাই মাসে ভারতের সাথে আইনগতভাবে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ ( দেশের সার্বভৌমত্বের কথা চিন্তা করেই ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু সরকার ভারতের সাথে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের আইনি ভিত্তি রচনা করে), ২০১৫ সালে সীমান্ত চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের ছিটমহল বিনিময় ( যেটার ভিত্তিও ১৯৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি)।  এ কথা হয়তো বলা যাবে না, ভারতের মতো বড় প্রতিবেশীর সাথে বাংলাদেশ সরকার সবসময় তার ন্যায্য হিস্যা বুঝে পেয়েছে। তবে এটা বলা যায়, যতটুকু পেয়ছে তা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই পেয়েছে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এবারের সফর ছিল ভিন্ন মাত্রিক। জাতিসংঘের সাধারণ সমাপ্তির পর পর এই সফর। যেটা পূর্বনির্ধারিত ছিল। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার আগে বৈশ্বিক নেতৃত্বের র্যাংরকিংয়ে মোদির যে অবস্থান ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হিস্টনে একটি স্টেডিয়ামে ৭০-৭৫ হাজার ভারতীয় অভিবাসীর সামনে ট্রাম্পের হাত ধরে হাঁটা এবং ট্রাম্পকে সমর্থনের আহ্বান জানানোর পর তার অবস্থান নিচের দিকে নেমে যায়। তার সাথে যোগ হয়েছিল কাশ্মীর ইস্যু। অন্যদিকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বক্তব্য রেখে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৈশ্বিক নেতৃবৃন্দের আলোচনায় চলে আসেন। মোদি দেশবাসীর কাছে তার হৃত অবস্থান পুনরুদ্ধারের জন্য দক্ষিণ এশীয় কর্তৃত্ব তার হাতে দেখানোর চেষ্টা করবে এটাই স্বাভাবিক। মোদির সেই চেষ্টাকে তুলে ধরার জন্য ভারতীয় মিডিয়াগুলোও সহায়তা করেছে। বাংলাদেশের সাথে এর আগে আরো বড় বড় চুক্তি হলেও বাংলাদেশের সরকার প্রধান এবারের মতো মিডিয়া কভারেজ আগে কখনো পান নি। কিন্তু বাংলাদেশে ঠিক তার উল্টোটা হয়েছে। মিডিয়া বিভিন্ন আঙ্গিক বের করে জনগণকে বিভ্রান্ত করেছে। আপনার সরকার প্রধান যখন বাইরের রাষ্ট্রের সাথে চুক্তিতে বসবে তখন সে আপনার প্রতিনিধিত্ব করে। আপনার স্বার্থ রক্ষায় যাতে সে যেন সচেষ্ট হয় সেই বিবেচনা থেকে সরকারকে সহায়তা করাটা সকলের কাজ হওয়া উচিত। প্রতিপক্ষ দেশের সরকার প্রধান যদি বুঝে যায় যে, আপনি আপনার সরকারকে খাটো করার জন্য বিশেষ উদ্দেশ্যে সংঘবদ্ধভাবে কাজ করবেন তখন সে ছড়ি ঘোরানোর সুযোগ পাবে। শেখ হাসিনা যখনই ভারতের সাথে কোন চুক্তি করতে গেছে তখনই কিছু মিডিয়া উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সেটাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে। এবারের সফরের পর আলোচিত ফেনী নদীর পানি নিয়ে যে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে সেটা নিয়েই বেশি শোরগোল পরিলক্ষিত। সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী ভারত ১.৮২ কিউসেক পানি সরিয়ে ত্রিপুরার সাবরুম শহরে নেওয়ার অনুমতি পেয়েছে। যার পরিমাণ দৈনিক ৫০ লক্ষ লিটার। যদিও ভারত অনেকদিন ধরে বেআইনিভাবে ফেনী নদীর পানি প্রত্যাহার করে আসছে। যার পরিমাণ আনুমানিক ২৫ কোটি লিটার। বিগত কোন সরকার এর প্রতিবাদ করতে পারে নি। তাই এ চুক্তির মধ্যে যারা মুহুরী চরের সেচ প্রকল্প ধ্বংস হওয়ার পাঁয়তারা দেখেন তারা সঠিক নন। কারণ এই সেচ প্রকল্প এতোদিন যেভাবে চলেছে সেভাবেই চলবে। বরং ভারতের বেআইনি বিষয়কে আইনি কাঠামোতে আনা হয়েছে। যেখানে সমঝোতার ব্যত্যয় ঘটলে বাংলাদেশ কথা বলার ক্ষেত্র পাবে। এই পানি প্রত্যাহার করতে দেওয়ার কারণও মানবিক সংকট থেকে উত্তরণে সহায়তা। সাবরুম অঞ্চলে পানীয় পানির সংকট। শুধুমাত্র মানবিকতা ও প্রতিবেশীসুলভতা  বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্মতি দিয়েছেন বলে বিবৃতি দিয়েছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়।

আরেকটি যে বিষয় উঠে এসেছে সেটা হল, এলপিজি রপ্তানি। এই বিষয়ে তথ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, এলপিজি মানে প্রাকৃতিক গ্যাস নয়, বরং ক্রুড ওয়েল বা অশোধিত পেট্রোলিয়াম পরিশোধন করার সময় প্রাপ্ত উপজাত। যা রপ্তানির সুযোগ দেশের জন্য লাভজনক।

এই সফরের মধ্য দিয়ে তিস্তা চুক্তি সম্পন্ন হবে বলে মনে করেছিল বাংলাদেশের জনগণ। তিস্তা চুক্তিটা সম্পন্ন করতে পারলে বাংলাদেশের জনগণের আস্থায় আসতে পারত ভারত সরকার। তবে এখানে পশ্চিমবঙ্গের একটা ভূমিকা থাকার কারণে এটা এই মুহুর্তে সম্ভবই না। কারণটা হল মোদি ও মমতার সম্পর্কের শিথিলতা। তবে শেখ হাসিনা নরেন্দ্র মোদির কাছ থেকে এই চুক্তি দ্রুত সম্পন্নের আশাবাদ নিয়ে এসেছেন। আশা ছিল রোহিঙ্গা প্রত্যাবসানে ও আসামের এনআরসি বিষয়ে সুস্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যাবে ভারতের কাছ থেকে। সেই জায়গাগুলোতে ভারতের বক্তব্য থাকলে দৃঢ়তা লক্ষণীয় ছিল না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতে সবার সাথে সহযোগিতামূলক অবস্থান চান। তিনি বিশ্বাস করেন বংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সামিটে তিনি বাংলাদেশের এই সম্ভাবনাকে ব্যবহার উপযোগী করে তোলার জন্য সকলকে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের উপর শেখ হাসিনার ঘোষিত ভিশন হল- ২০২১-এ মধ্যম আয়ের দেশ, ২০৪১-এ উন্নত আয়ের দেশ ও ২১০০ সালের ডেল্টা প্ল্যান। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে শেখ হাসিনা পারস্পারিক সহযোগিতার ভিত্তিতে কানেক্টিভিটিতে বিশ্বাসী। এক সময় যারা ট্রানজিটের বিপক্ষে কথা বলেছিল আজ তারাও এই কানেক্টিভিটির উপযোগিতার কথা স্বীকার করছে। এটা ব্যবহার করে কীভাবে বাংলাদেশ লাভবান হতে পারে বিতর্কটা এখন সেই জায়গায়। কিন্তু লাভবান হতে পারার উপায়টাতে শেখ হাসিনাই হাত দিয়েছিলেন। শেখ হাসিনার ভীষণ ও অর্থনৈতিক দর্শন একসাথে বুঝতে হবে। গোঁজামিলটা হবে এই দুইটাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখতে গেলে। টেকসই উন্নয়নের চাহিদার সাথে যোগান তৈরি করার অন্যতম ভিত্তি হল পারস্পারিক সহযোগিতা ও কানেক্টিভিটি। শেখ হাসিনা তার ভিশন ও অর্থনৈতিক দর্শনের জায়গা থেকে এটি করেছেন। এখন প্রতিপক্ষের পালা। ভারতকে আঞ্চলিক সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক দর্শনের জায়গা থেকে কিছু করে দেখাতে হবে এবং সেই সুযোগ ভারতের আছে। ভারত যদি মনে করে বাংলাদেশের জনগণকে আস্থায় না নিয়ে সে তার স্বার্থ উদ্ধার করতে পারবে। সেটা ভুল হবে। ভারতের অনেক কাজে বাংলাদেশের মানুষের শঙ্কিত হওয়ার জায়গা আছে। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। বাংলাদেশ যখন কানেক্টিভিটির কথা বলছে ভারত তখন সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া বৃদ্ধি করছে। সীমান্তে বাংলাদেশী নাগরিক হত্যা এবং আসামে পরিচালিত এনআরসির প্রভাব নিয়ে শঙ্কিত বাংলাদেশের জনগণ। এই শঙ্কা দূর করার দায় কোন না কোনভাবে ভারত সরকারের উপর পড়ে এবং সেটা দূর করে আঞ্চলিক শান্তি ও সহযোগিতায় ভারতের কাজ করা হওয়া উচিত একমাত্র লক্ষ্য।

সায়েম খান
রাজনৈতিক কর্মী