শিক্ষা ২৮ আগস্ট, ২০২৩ ০৯:৫৮

ঢাবিতে এবার ছাত্রীদের নেকাব খুলে ভাইভা নেওয়ার অভিযোগ

ঢাবি প্রতিনিধি: ২০১৯-২০ সেশনের তৃতীয় বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা পরবর্তী ভাইভার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিটিউটের (আইইআর) ছাত্রীদের নেকাব খুলে ভাইভা (মৌখিক পরীক্ষা) নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গত মাসের শেষে দিকে এ ঘটনা ঘটলেও সম্প্রতি গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে মুখ খুলছেন ভুক্তভোগী ছাত্রীরা।

ছাত্রীদের অভিযোগ, মৌখিক পরীক্ষায় নিকাব ও হিজাব পরিধান করায় একজনকে জোরপূর্বক নিকাব খুলে ভাইভা নেওয়া হয় এবং অন্য একজন শিক্ষার্থীকে ভাইভা দিতে দেওয়া হয়নি। আরও কিছু শিক্ষার্থীকে জোরপূর্বক হিজাব খুলে মুখ ও কান দেখে ভাইভা নেয়া হয়। তাছাড়া ওই ইনস্টিটিটিউটে বিভিন্ন সময়ে হিজাব-নিকাব পড়ায় শ্রেণিকক্ষে কয়েকজন শিক্ষক কর্তৃক নানাভাবে হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে।

তবে ভাইভা বোর্ডের প্রধান এবং নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম ওয়াহিদুজ্জামান চান, যারা পর্দা করে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি না হয়ে বাসায় থেকে পড়াশোনা করার পরামর্শ দিয়েছেন।

ঘটনায় সংশ্লিষ্ট বাকি শিক্ষকরা হলেন ওই ইনস্টিটিটিউটের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান ও অধ্যাপক মোহাম্মদ নুরে আলম সিদ্দিকী।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা জানান, যারা হিজাব পড়ে তাদেরকে ইচ্ছাকৃতভাবে হিজাব খুলে কান দেখেন শিক্ষকরা। এ ঘটনার সময় নিকাব পড়ার কারণে ভাইভা বোর্ডে তাদেরকে বিভিন্নভাবে কথায় জর্জরিত করা হচ্ছিলো। বুঝানো হচ্ছিলো যেনো নিকাব না খুললে তাদের ভাইভা নেবে না। শেষ পর্যন্ত নিকাব না খোলায় ভাইভা নেয়া হয়নি একজনের। অনেক সময় ক্লাসে নিকাবের কারণে হেনস্তার শিকার হতে হয় তাদের।

শিক্ষার্থীরা আরও বলেন, এখানে নির্দিষ্ট করে কিছু শিক্ষক এমন কাজ করে থাকেন। অনেক সময় তারা নিকাব পড়ার কারণে বলে ‘ধর্মের দায়িত্ব পালন করতেছো কিন্তু এটাতো ধর্ম না’। ওনারা ধর্মকে নিজেদের মতো করে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেন। এছাড়াও ভাইভা বোর্ডে নিকাব পরিধান করে থাকলে ভাইভায় অংশগ্রহণের সুযোগ দিবে না বলে হেনস্তা করে থাকেন।

নিকাব খুলে জোরপূর্বক ভাইভা দেয়া ওই ছাত্রী বলেন, ভাইভা বোর্ডের সভাপতি ছিলেন অধ্যাপক ওয়াহিদুজ্জামান স্যার। আমি যাওয়ার পূর্বেও যারা হিজাব পড়ে গিয়েছে তিনি তাদের হিজাব খুলে কান চেক করেছেন। আমি প্রবেশের সাথে সাথে তিনি বলেন, নিকাব পড়া থাকলে আমার ভাইভা নিবেন না। তখন সেখানে একজন ফিমেল টিচার ছিলেন, আমি ম্যামের সাথে কথা বলি যে যদি আমাকে আইডেন্টিফাই করার প্রয়োজন হয় তাহলে তো ফিমেল টিচার আছেন। এটাতো কোনো সমস্যা হওয়ার কথা না। 

তিনি বলেন, এরপরে ম্যাম আমাকে বলেন, এটা কোনোভাবে সম্ভব না। স্যার ভাইভা বোর্ডের সভাপতি তোমাকে মুখ খুলেই ভাইভা দিতে হবে নয়তো এটা কোনোভাবেই গ্রহণ করবেন না। এ প্রসঙ্গে ওয়াহিদুজ্জামান স্যার বলেন, ইসলাম এতো কঠোর না এবং নিজেদের মতো করে অনেক কিছুই আমাকে বুঝানোর চেষ্টা করেন। এসময় তারা নিজেদের মত করে বিভিন্ন কথা বলতে থাকেন এবং আমাকে কিছু বলার সুযোগ দিচ্ছিলেন না। আমাকে বাধ্য করা হচ্ছিলো যেনো আমি নিকাব খুলে ভাইভা দেই। একসময় আমি বের হয়ে যাই। 

এ ঘটনার পর ফিমেল টিচার এসে আমাকে বুঝানোর চেষ্টা করেন যেন আমি নিকাব খুলে ভাইভা দেই। আমি ম্যামকে বলেছি, ‘ম্যাম এটা সম্ভব না’। স্যার আমাকে বলেন ‘ঠিক আছে তোমার কান খুলতে হবে না, তুমি মুখ খুলে ভাইভা দাও’। ম্যাম আমাকে বুঝানোর চেষ্টা করেন স্যার যেহেতু চেয়ারম্যান আমার (ফিমেল টিচার) আসলে কিছুই করার নেই, তোমার এভাবেই ভাইভা দেওয়া উচিত। এসময় আমি নার্ভাস হয়ে যাই এবং মুখ খুলেই ভাইভা দিতে যাই-বলেন আরেক ছাত্রী। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক ড. ওয়াহিদুজ্জামান চাঁন বলেন, ধর্ম পালন আমাদের সাংবিধানিক অধিকার কিন্তু গোঁড়ামি করাটা সংবিধানবিরোধী। ইসলাম এত কঠিন নয়, ক্ষেত্র বিশেষে সহজ করা হয়েছে। আবার কোরআন বা হাদিসের কোথাও নেই তাকে মুখ ঢেকে রাখতে হবে, মুখ খোলা রাখা যায় সবসময়ই। এমনটা না হলে হজ্বে যাওয়ার সময় মুখ ও কান খোলা রাখার বাধ্যবাধকতা থাকতো না। টিচারদের সামনে মুখ খুললে যদি তার পর্দা লঙ্ঘন হয় তাহলে সে যে রাস্তায় চলছে, তাকে সবাই দেখছে, সে অন্য পুরুষকে দেখছে, অন্য পুরুষের কণ্ঠ শুনছে, ছেলেদের পাশে বসে ক্লাস করছে, ছেলে বন্ধুদের সাথে কথা বলছে এসবে কি পর্দা ভঙ্গ হচ্ছে না?

তিনি বলেন, ভাইভা বোর্ডে আমাদের দেখতে হবে আমরা কার ভাইভা নিচ্ছি এবং তার রিয়েকশন বুঝে মার্কিং করতে হয়। কেউ চাইলেই মুখ না খুলে হজ্বের জন্যও যেতে পারবে না। হজ্বে যেতে হলেও মুখ দেখাতে পারলে ভাইভায় সমস্যা কি? তাছাড়া ভাইভায় শিক্ষক ছাড়া ছাত্ররাও থাকে না। তাছাড়া চাকরির সময় তারা মুখ খুলতে পারলে বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের সমস্যা কি? আমার মা-খালারা পর্দা করেন তারা তো চাকরি করতে যাবে না। সে যদি পর্দা ভালো করে করতেই চায় তাহলে সে ভার্সিটিতে কেন এসেছে? ঘরে থাকবে সে। তারা বাসায় থেকে পড়াশোনা করুক ভার্সিটি তাদের জন্য নয়।

অভিযোগ দেওয়া ওই ছাত্রীকে উগ্রবাদী দলের সদস্য হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গত মাসের ঘটনা সে এক মাস পরে সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেছে। তার স্বাধীনতা খর্ব হলে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করতো। এখানে অবশ্যই কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। সে হয়তো কোন উগ্রবাদী দলের সদস্য আর সেই দল থেকে তাকে এতদিন পরে অভিযোগ করতে বলেছে। নিউজ করা হবে, এরপর তারা আবার রাস্তায় মিছিল নিয়ে বের হবে। এটা একটা পলিটিক্যাল এজেন্ডাও হতে পারে যা একটা নিউজের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হতে পারে। 

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নুরে আলম সিদ্দিকী ভাইভা ও প্রেজেন্টেশনে মুখ খুলতে বলার কথা স্বীকার করে বলেন, গত সেমিস্টারের আগের সেমিস্টারে একজন শিক্ষার্থীর ভাইভা নিতে অপারগতা প্রকাশ করেছিলাম। কারণ সে নিকাব পরিধান করেছিল। এটা আমি প্রেজেন্টেশনের ক্ষেত্রেও করে থাকি। 

তিনি বলেন, আমাদের কারিকুলামের ভাইভাতে বিষয় জ্ঞানের পাশাপাশি দক্ষতা অর্জন হিসেবে কমিউনিকেশন স্কিলের কথা বলা আছে। ফলে শিক্ষার্থীরা বিষয় জ্ঞানের পাশাপাশি কিভাবে ব্যাখ্যা করে সেটিও লক্ষ্য করতে হয়। কিন্তু কোন শিক্ষার্থীর মুখ ঢেকে রাখলে সেটা বুঝতে পারা সম্ভব হয় না। আমি পরিষ্কারভাবে বলেছি মুখ ঢাকা থাকলে আমি মূল্যায়ন করতে পারবো না। হিজাব পড়া অবস্থায় মুখ দেখা গেলে কোনো সমস্যা নেই তবে নিকাব পড়া থাকলে মূল্যায়নে সমতা নিশ্চিত হয়না।

এ বিষয়ে ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, এই ইস্যুতে আমাদের দুইটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে। প্রথমটি হলো আইডেন্টিটি ক্রাইসিস রাখা যাবে না, আর অন্যটি হলো অন্যের ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ নষ্ট করা যাবে না। ভাইভায় যেমন কে পরীক্ষা দিচ্ছে সেটি জানা প্রয়োজন আবার কেউ ধর্মীয় বিধান পালন করছে সেটাও মেনে নেওয়া জরুরি। এ ব্যাপারে আমরা আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।


আমাদেরকাগজ/এইচএম