অপরাধ ও দুর্নীতি ১৯ জুলাই, ২০২০

র‌্যাবের কাছে সাহেদের বিরুদ্ধে ৯২ অভিযোগ

রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর জন্য র‌্যাব হটলাইন চালু করার পর একদিনে ৯২টি অভিযোগ জমা পড়েছে।

এই অভিযোগকারীদের একজন হাই কোর্টের আইনজীবী গাজী নাসরিন আকতার নাজ বলেন, প্রায় দশ বছর আগে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে বিডিএফ নামে একটি সিকিউরিটি সার্ভিস প্রতিষ্ঠানে ৪০ হাজার টাকা বেতনে চাকরি নিয়েছিলেন। প্রথম দুই মাস বেতন দিলেও পরে তিন মাস ধরে বেতন না দেওয়ায় চাকরি ছেড়ে দেন তিনি।

পরে এই সিকিউরিটি সার্ভিসের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ সাহেদ এবং তার লোকজন এমএলএম ব্যবসার ফাঁদে ফেলে আমার কাছ থেকে এক লাখ ৮০ হাজার টাকাও নেন। বেতন ও এই নগদ টাকার পুরোটাই গচ্ছা গেছে।

সাহেদের বিরুদ্ধে এখন আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবছেন জানিয়ে নাজ বলেন, ওই সময় সাহেদের রিজেন্ট হাসপাতাল বা এ ধরনের কিছু ছিল না।

মনে হয় তার প্রথম দিকের প্রতারণার শিকার হয়েছি আমি।

নাজসহ এ রকম ৯২ জন গত ২৪ ঘণ্টায় সাহেদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ করেছেন র‌্যাবের দেওয়া মেইল ও হটলাইন সেবায়। র‌্যাবের এই সেবা চালু হয় শুক্রবার সন্ধ্যার পর থেকে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক আশিক বিল্লাহ শনিবার রাতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, আমরা ৯২টি অভিযোগ পেয়েছি। এই ৯২টির মধ্যে ২০টি মেইলে এবং ৭২টি ফোনে।

আমরা এটাকে হটলাইন বলছি না, হট সেবা বলছি। অভিযোগকারীদের কেউ চিকিৎসার নামে প্রতারিত হয়েছেন, কেউ বালু-পাথর সরবরাহ করতে গিয়ে প্রতারিত হয়েছেন, কাউকে ব্যাংক লোন পাইয়ে দেবে বলে অগ্রিম টাকা নেওয়া হয়েছে।

৯২টি অভিযোগই ভিন্ন ধরনের জানিয়ে এই র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, সাহেদ নানাভাবে সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণা করত বলে এসব অভিযোগ থেকে জানা যাচ্ছে।

অভিযোগকারীদের আরেকজন ঠিকাদার মোহাম্মদ মোস্তফা বর্তমানে থাকেন উত্তরায় রিজেন্ট হাসপাতালের পাশের ১০ নম্বর সেক্টরে। এলাকার ঠিকাদার হিসাবে তার পরিচিতি আছে।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এলাকার কিছু তরুণ সাহেদের রিজেন্ট হাসপাতালে চাকরি করে।

তাদেরই কয়েকজন গত ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দিকে আমার কাছে এসে বলে, বস (মোহাম্মদ সাহেদ) কিছুটা বিপদে পড়েছে, ১০ লাখ টাকা লাগবে। একটু ভয়ভীতিও দেখায়। পরে সাহেদের সামনে নিয়ে যায়।

সাহেদের সাথে কথা বলতে গিয়ে কখনই তাকে প্রতারক মনে হয়নি। পরে ১০ লাখ টাকা দেই, সাথে সাথে সাহেদ ফেব্রুয়ারি মাসের শেষে দিকের একটি তারিখে ১০ লাখ টাকার একটি চেক দেন।

মোস্তফা বলেন, ওই তারিখে ব্যাংকে চেক জমা দিতে গেলে ব্যাংক জানায়, একাউন্টে টাকা নেই। অফিসে গেলে চেক পরে জমা দিতে বলে। পরে আবার গেলে আবারও ডিজঅনার হয়। এরপর অফিসে গেলে সাহেদ হুমকি দেয় তাকে না জানিয়ে যেন ব্যাংকে না যাই।

পরে আবার রিজেন্ট অফিসে টাকার জন্য গেলে হুমকি দেওয়া হয় বাড়াবাড়ি না করার জন্য।

সাহেদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর র‌্যাবের কাছে অভিযোগ দেন মোস্তফা। এরপরও হুমকি পেয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

আপনি রিজেন্টের লোক না তো ভাই। আমাকে রিজেন্টের এক লোক ফোন করে আজই হমকি দিয়েছে। আমি র‌্যাবে অভিযোগ করেছি, থানায় মামলা করতে গেলে আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, মোবাইলে বলেন তিনি।

মো. করিম নামে আরেক বালু ব্যবসায়ী অভিযোগ করেছেন, প্রায় একশ কোটি টাকার বালু সরবরাহের জন্য সাহেদ গত বছরের প্রথম দিকে তার সাথে চুক্তি করেছিলেন। শর্ত অনুযায়ী ৬ লাখ টাকা সাহেদকে জামানত দিয়েছিলেন তিনি। এই বালু সিলেট থেকে কক্সবাজার নেওয়ার কথা ছিল।

এই কাজ পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজ যোগাড় করে ব্যাংকে ঋণের জন্য আবেদন করা হয়। এজন্য বিভিন্নভাবে আরও ৪ লাখ টাকা খরচ হয়। ব্যাংক ঋণ দেওয়ার শর্ত হিসাবে সত্যতা যাচাইয়ের জন্য মোহাম্মদ সাহেদের অফিসে যোগাযোগ করে জানতে পারে, তারা এ ধরনের যে চুক্তি করেছিল তা বাতিল হয়ে গেছে।

চুক্তি বাতিলের কথা মোহাম্মদ সাহেদের পক্ষ থেকে আমাকে জানানো হয়নি। ব্যাংকে ঋণের অগ্রগতি জানতে গেলে বাতিলের কথা জানায়। পরে জামানতসহ বিভিন্ন স্থানে খরচের টাকা চাইতে গেলে হুমকি দেয়। একাধিকবার অফিসে গিয়ে কোনো লাভ হয়নি।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক আশিক বিল্লাহ জানান, তারা প্রতিটি অভিযোগ আমলে নিয়ে কাজ করছেন। অভিযোগের ধরন অনুযায়ী ভুক্তভোগীদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন।

গত ৬ ও ৭ জুলাই উত্তরায় সাহেদের রিজেন্ট হাসপাতাল ও রিজেন্ট গ্রুপের অফিসে অভিযান চালিয়ে কোভিড- ১৯ পরীক্ষার ভুয়া প্রতিবেদন দেওয়ার প্রমাণ পায় র‌্যাব। এই ঘটনায় ৭ জুলাই উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি মামলা হয়। মামলার পর থেকে সাহেদ পলাতক ছিলেন।

নয় দিন পর বুধবার সাতক্ষীরা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। ওই মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এখন মামলার তদন্ত সংস্থা গোয়েন্দা পুলিশের কাছে ১০ দিনের রিমান্ডে আছেন সাহেদ।