সোশ্যাল মিডিয়া ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০৫:২৬

যে নারী নিজের প্রাণের বিনিময়ে বাঁচিয়েছিলেন তিন শতাধিক মানুষকে

ডেস্ক রিপোর্ট ।।

অসীম সাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন তিনি। নিজের জীবনের বিনিময়ে বাঁচিয়েছিলেন প্রায় তিন শতাধিক নিরীহ মানুষের প্রাণ। ৭ সেপ্টেম্বর ছিলো সেই সাহসী নারী 'নীরজা ভানোত'র জন্মদিন। এই সাহসী ও সংগ্রামী মেয়েটির জীবন সংগ্রাম থেকে শেখার আছে অনেক কিছু।

সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় এই সাহসী নারীর জীবন কাহিনী নিয়ে একটি স্ট্যাটাস ভাইরাল হয়। যেখানে উঠে এসেছে তার একটি সংক্ষিপ্ত জীবন কাহিনী।

স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে ধরা হলো :

১৯৪৭ সালে যখন ভারত ও পাকিস্তানকে আলাদা করা হয়, তখন থেকেই প্রতিবেশী এই দুই দেশের মাঝে চরম বৈরিতা। কাশ্মীর ইস্যুতে এখনও তাদের মাঝে চলছে যুদ্ধের প্রস্তুতি। এক দেশ ডানে গেলে অন্য দেশ চলে বামে। তাই কোনো মানুষের জীবনে ভারত এবং পাকিস্তান- এই দুই দেশেরই সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান পাওয়ার ঘটনা নিতান্তই বিরল। আজ যে মেয়েটার কথা লিখছি তিনি সেই অতি বিরলদের একজন। পাকিস্তান সরকার তাকে দিয়েছে তাদের দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার 'নিশান এ পাকিস্তান'।

যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে শান্তিপ্রতিষ্ঠার জন্যে ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কারও পেয়েছে মেয়েটি- 'আশোক চক্র'। মাত্র ২৩ বছরের জীবনেই এত অর্জন মেয়েটির। এমন কারও জীবন কাহিনী সত্যিই এক কিংবদন্তি।
মেয়েটির নাম নীরজা ভানোত। ১৯৬৪ সালে ভারতের চন্ডীগড়ে জন্ম নেওয়া মেয়েটি বেড়ে উঠে মুম্বাইতে। পড়ালেখার পাশাপাশি সে মডেলিং শুরু করে খুব অল্প বয়সে। রূপে ও গুণে অনন্য ছিলো মেয়েটি। তাই দ্রুত সফলতাও আসে। কিন্তু ঐ সময়ে মডেলিং পেশাটা সবার দৃষ্টিতে সম্মানজনক ছিলোনা। সমাজ এবং পরিবার থেকে সিদ্ধান্ত আসে মডেলিং ছেড়ে বিয়ে করতে হবে। নীরজা বাধ্য হয় মডেলিং ছেড়ে দিতে। বিয়ে হয়ে যায় তার। কিন্তু কি দূর্ভাগ্য, যৌতুকের জন্য শ্বশুর বাড়ি থেকে ভীষণ চাপ আসতে শুরু করে বিয়ের প্রথম থেকেই, সেই সাথে স্বামীর শারীরিক নির্যাতন! বাধ্য হয়ে নীরজা তার মা-বাবাকে জানায়।

এরপর সাহস করে ডিভোর্স নিয়ে নেয় নীরজা। নতুন করে পথচলার স্বপ্ন দেখে সে আবার। ক্যারিয়ারে কিছু একটা করতে হবে, নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে- এই ছিলো তার প্রবল জেদ আর প্রচন্ড মনোবল। মধ্যবিত্ত পরিবারের এই মেয়েটির ছোটবেলা থেকে শখ ছিলো আকাশ ছোঁয়ার। সদ্য ডিভোর্সী মেয়ের জন্য সেই সময়টা খুব সহজ ছিলোনা। তবু সে নিজেকে গড়ে তোলে এবং বিখ্যাত 'প্যান অ্যাম' এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট এ্যাটেন্ডেন্ট হিসেবে চাকুরি পায় নিজের যোগ্যতায়। ফ্লোরিডায় ট্রেনিং শেষে বিমানে কাজ শুরু করার অল্প কিছুদিনের মাঝেই প্রমোশন পেয়ে নীরজা হয়ে যায় চীফ ফ্লাইট এ্যাটেন্ডেন্ট, যাকে বলা হয় ‘পার্সার’। সহজে বললে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের কেবিন ক্রু’দের বস!

১৯৮৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর, নীরজা ভানোতের জীবনে ভীষণ আনন্দের এক দিন। প্রমোশন পাওয়ার পর 'প্যান অ্যাম' এয়ারের ফ্লাইটে প্রথমবার সে চীফ ফ্লাইট এ্যাটেন্ডেন্ট। ফ্লাইটটি মুম্বাই থেকে নিউইয়র্ক যাচ্ছিলো। মাঝে পাকিস্তানের করাচীতে ছিলো ট্রানজিট। আকস্মিকভাবে করাচী বিমানবন্দরে ফ্লাইটটি ছিনতাই করে সন্ত্রাসীরা। ঐ সময় ফ্লাইটটির পুরো দখল চলে যায় সন্ত্রাসীদের হাতে। তবে তখনও ফ্লাইটটি রানওয়েতে ছিলো। যে কোনো মূহুর্তে আকাশে উঠবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। ফ্লাইটের পার্সার হিসেবে নীরজা অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তা ও সাহসের সাথে ককপিটের দুই পাইলটকে তাৎক্ষণিকভাবে ফ্লাইট ছিনতাই হওয়ার তথ্য জানিয়ে দিতে সক্ষম হয়। এতে দুই পাইলটই আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী বিমান আকাশে না উড়িয়ে ককপিট থেকে বিশেষ ব্যবস্থায় বের হয়ে নিরাপদ স্থানে চলে আসেন। নীরজা’র এই বিদ্যুৎ গতির বুদ্ধির জন্যে সন্ত্রাসীরা পাইলট না থাকায় বিমানটি উড়িয়ে নিতে পারেনি। উড়িয়ে নিয়ে গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতো।

১৯ ঘন্টা সন্ত্রাসীরা জিম্মি করে রাখে প্লেনের ৩০০ জন যাত্রীকে। এই পুরোটা সময় ভীষণ সাহস আর কৌশলে নীরজা ধীরে ধীরে সবাইকে বাঁচানোর উপায় খুঁজতে থাকে। চাইলে এক সময় পালিয়ে যেতে পারতো সে। তার সুযোগ ছিলো। অন্য কেবিন ক্রু’রা এক পর্যায়ে পালিয়ে নিজেদের জীবন বাঁচাতে পেরেছিলো। কিন্তু নীরজা এমনটা করেনি। তার উদ্দেশ্য ছিলো যে কোনো মূল্যে সকল যাত্রীকে বাঁচানো। ধীরে ধীরে প্লেনের প্রায় সব যাত্রীকেই লুকিয়ে ইমার্জেন্সি এক্সিট দিয়ে বের করে দিতে সক্ষম হয় নীরজা। কিন্তু একদম শেষে ধরা পড়ে যায় সন্ত্রাসীদের চোখে। যাত্রীদের বাঁচানোর অপরাধে খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করা হয় নীরজাকে। ঐ সময়ও সে তিনটি বাচ্চাকে প্লেন থেকে লুকিয়ে বের করতে চেষ্টা করছিলো, তার গুলিবিদ্ধ শরীর দিয়েও ঐ বাচ্চাদের আগলে রাখছিলো। ঐ ফ্লাইটে ৭ বছরের এক শিশু ছিলো। এখন সে বিখ্যাত এয়ারলাইন্সের পাইলট। তার কথায় 'আমার জীবনের প্রতিটা ক্ষণ আমি নীরজাকে স্মরণ করি। কারণ আমি তার কারনেই দ্বিতীয় জীবন পেয়েছি'।

ঐ জীবনের কি-ই বা মূল্য যদি তা অন্যের কাজে না এলো? ৩০০ মানুষের জীবন বাঁচিয়ে মাত্র ২৩ বছর বয়সে চলে গেছেন নীরজা ভানোত। তবে তার নাম বেঁচে রইবে শতবছর কোটি মানুষের অন্তরে সাহসীকতার প্রতীক হয়ে। এই মহীয়সি নারীকে নিয়ে ২০১৬ সালে বলিউড সিনেমা তৈরি করেছে- 'নীরজা'। চাইলে যে কেউ দেখতে পারে, সোনম কাপুরের অভিনয়ে অসাধারণ একটা ছবি। আমার দুই মেয়েকে আমি যখন এই গল্প বলি, যখন সিনেমাটা দেখাই- তাদের চোখে জল আসে। হয়তো তারাও মনে মনে ‘নীরজা’ হওয়ার স্বপ্ন দেখে। আজ ৭ সেপ্টেম্বর, নীরজা ভানোতের জন্মদিন। তার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা...