নারীমেলা ৮ মার্চ, ২০২০

পাত্র ভাল মানুষ কি না তাতে গুরুত্ব দেয়া উচিৎ: আজমেরি

ডেস্ক রিপোর্ট ।। 

কাজী আসমা আজমেরি, ফেসবুকে যার নামের পাশে লেখা ‘বাংলাদেশি ওয়ার্ল্ড ট্রাভেলার’ অর্থাৎ ‘বাংলাদেশি বিশ্ব ভ্রমণকারী’। তিনটি শব্দই যথেষ্ট আজমেরির পরিচয় তুলে ধরতে। হ্যাঁ, বাংলাদেশি এই নারী ভ্রমণ করে বেড়াচ্ছেন পুরো বিশ্ব। ভ্রমণ করা দেশের তালিকায় ছুঁয়ে গেছেন সেঞ্চুরির মাইলফলক। বাংলাদেশের সবুজ রঙা পাসপোর্ট হাতে এখন পর্যন্ত ১১৫টি দেশ ভ্রমণ করেছেন আজমেরি। স্বাধীনচেতা ও ভ্রমণ প্রিয় এই নারীর সঙ্গেই কিছুক্ষণ আড্ডায় জানা হলো তার পথ চলা, ভাবনা আর ইচ্ছে নিয়ে।

শুরুটা কিছুটা মন খারাপ করেই করলেন আজমেরি। করবেন নাই বা কেন? বর্তমানে তার পরিচয়, তার ভ্রমণ কিংবা সেই সংক্রান্ত যাবতীয় কিছু। কিন্তু লোকে তার সঙ্গে আড্ডায় জানতে চায় বাবার পরিচয়, দাদার পরিচয়, শিক্ষা। একজন মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার কাজ। তাই আজমেরির ব্যক্তিগত জীবনে ঢুঁ না মেরে সোজা চলে গেলাম কাজের ক্ষেত্রে।  

খুলনার মেয়ে আজমেরি এখন পর্যন্ত ১১৫টি দেশ ভ্রমণ করেছেন। তালিকার সর্বশেষ দেশ গ্রিস। যদিও সংখ্যা নিয়ে খুব একটা ভাবনা নেই তার। আজমেরি বলেন, ‘আমার কাছে আসলে কয়টা দেশ ঘুরলাম সেই সংখ্যাটি গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমার কাছে প্রাধান্য পায়, কী দেখছি বা কী ভালো লাগছে। এমনও হয়েছে রাশিয়া ভালো লেগেছে বলে প্রায় ৩ মাস সময় নিয়ে সেখানে ঘুরেছি। অনেক স্থানেই গিয়েছি একের অধিকবার। দেশের সংখ্যা বা সময়ের চেয়ে নতুন বা অজানা কোনো স্থান সম্পর্কে, সেখানকার ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার আগ্রহ আমার বেশি।’ 

কীসের টানে এত দেশ ভ্রমণ করা? নতুন দেশের কোন বিষয়টি বেশি আকৃষ্ট করে? মানুষ, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য না প্রকৃতি? জানতে চাই আজমেরির কাছে। প্রথমের কিছুটা আক্ষেপ নিয়েই নিজের দেশের সংস্কৃতি নিয়ে বললেন তিনি। স্কুলের অনুষ্ঠানে হিন্দি গানের তালে শিক্ষার্থী নাচছে, অন্য দেশের সংস্কৃতির চর্চা হচ্ছে খুব সহজেই। আমাদের পোশাক থেকে শুরু করে খাবার, ভাবনা সবকিছুতেই যেন ঐতিহ্য আর সংস্কৃতিকে ভুলতে বসেছি। 

আজমেরি বলেন, ‘আমি যখন দেশের বাইরে যাই তখন সেখানকার সংস্কৃতি মানতে চেষ্টা করি। সেখানকার মানুষ কীভাবে চলে, কীভাবে থাকে, সরকারকে কতটা ভালোবাসে, তারা সুখী কি না সবকিছু বুঝতে চেষ্টা করি। সে সঙ্গে কোনো দেশে গেলে আরেকটি ব্যাপারে আমি খুব গুরুত্ব দেই যে সেখানকার মেয়েরা কতটা স্বাবলম্বী বা কতটা কাজ করেন। আমাদের দেশের মেয়েরা খুব একটা কাজ করে না। বিশেষ করে, বিয়ের পর। স্বামীর ভালো চাকরি বা ব্যবসা থাকলে স্ত্রী আর নিজে কিছু করতে চান না।’

কাজের প্রতি আন্তরিকতা খুব কম নারীর মধ্যে দেখা যায়। তবে দেশের বাইরের গল্পটা যেন ভিন্ন। সেখানে একজন নারী কাজ করছে নিজের জন্য। তার স্বামী কত টাকা রোজগার করছেন এটি মূল বিষয় থাকে না। আজমেরি ভ্রমণের স্মৃতিচারণ করেই বলেন, ‘আমি অস্ট্রেলিয়ায় একজন নারীকে দেখেছিলাম যিনি একজন ডাক্তার। তার স্বামী পেশায় একজন ওয়েটার। এমনটাই আসলে হওয়া উচিত। একজন নারীর নিজের পরিচয়ে পরিচিত হওয়া উচিত, তার স্বামী কী করে তার পরিচয়ে নয়।’

বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে মেয়ের বিয়ের ক্ষেত্রে মা-বাবা গুরুত্ব দেন ছেলে ভালো ইনকাম করে কি না। আজমেরি মনে করেন, সমাজ থেকে এই বিষয়টি বদলানো উচিত। পাত্র ভালো কি না সেটি গুরুত্বপূর্ণ, সে কেমন মানুষ তাতে গুরুত্ব দেওয়া উচিত, তার রোজগারে নয়। আর এর জন্যই প্রতিটি মেয়েকে স্বাবলম্বী হতে হবে। নিজের স্বপ্ন বা ইচ্ছা পূরণ করতে যেন স্বামীর ওপর নির্ভরশীল না হতে হয়। 

নারী স্বাধীনতা সম্পর্কে জানতে চাই আজমেরির কাছে। তিনি বলেন, ‘নারীর স্বাধীনতা মানে সে নিজের মতো চলছে, নিজেকে জানছে, নিজের মতকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে ভ্রমণের কথাই চলে আসে। একজন নারী ঘরে থাকলে বা আশেপাশের মানুষের ওপর নির্ভরশীল হলে তার জীবন কিছুটা হলেও পরনির্ভশীল। কিন্তু তিনি যখন নিজে কোনো কাজ করবেন বা নিজেই কোথাও ভ্রমণ করতে যাবেন তখন তার মধ্যে স্বনির্ভরশীলতা জন্মাবে। কীভাবে হোটেল বুকিং দিতে হয়, কী করে নিজের লাগেজ টানতে হয় সব শিখবে। যা পরবর্তীকালে তার জীবনে চলার পথ সুগম করে দেবে।’

বিশ্ব ভ্রমণের মতো একটি বিষয় মাথায় এলো কী করে? জানতে চাইলে আজমেরি বলেন, ‘২০০৯ সালের ঘটনা। আমার এক বন্ধু মেরিনে চাকরি করতেন। তার বদৌলতে তিনি ২৬টি দেশ ভ্রমণ করেছেন। আমি একদিন তার বাসায় গিয়েছিলাম। তার ভ্রমণকাহিনী শুনে আমি খুব আগ্রহ প্রকাশ করি এবং বলি যে আমিও তোমার মতো ভ্রমণ করব। 

সেদিন আমার বন্ধুর মা আমাকে খুব অবজ্ঞা করে বলেছিলেন, তুমি মেয়ে, তোমার এসব করার দরকার নেই। বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে ঘুরো যদি সে চায়। নিজেকে তখন খুব তুচ্ছ আর দুর্বল লেগেছিল। আরেকজন পছন্দ করবে কি না আর আমাকে তার পছন্দের ওপর নির্ভর করতে হবে- কেন? আমি কেন ঘুরতে পারব না, একা একা? কারণ,আমি একজন মেয়ে। মেয়েদের টিকেটের দাম কি বেশি ছেলেদের চেয়ে? আমি যে ইউনিভার্সিটিতে পড়েছি, আমার বাবা যেই টাকা আমার জন্য দিয়েছেন একটি ছেলের জন্য সেই একই টাকা দিতে হয়েছে, একই শিক্ষক আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন। তাহলে কেন এত ভেদাভেদ, শুধুমাত্র আমি একজন নারী বলে। সেখান থেকেই নিজের মনে জেদ চাপে।’

অর্থনৈতিক জোগান, সামাজিক বিব্রতকর পরিস্থিতি আর নতুন দেশের ভিসা পাওয়ার জন্য লড়াই— এই তিন সংগ্রাম আজমেরির নিত্য সঙ্গী। তবে থেমে থাকার মেয়ে তিনি নন। নিজের ভ্রমণের তালিকায় যোগ করতে চান নতুন আরও দেশ। নিজের পথ চলার গল্প শোনাতে চান সব ছেলে-মেয়েকে। যেন তারা নতুন করে জীবনকে ভাবতে শেখে। সে সঙ্গে অভিভাবকদের উদ্দেশে আজমেরি বলেন, ‘আপনার কন্যা সন্তানকে ভ্রমণে যেতে দিন। ভ্রমণ তার জীবনকে নতুন করে সাজাতে সাহায্য করবে। তবে অবশ্যই তা ১৮ বছরের আগে নয়।’

বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে বিশ্ব ভ্রমণ করা এই নারীর প্রতি রইলো শুভেচ্ছা ও শুভকামনা।